শ্রমজীবী আর মেহনতি মানুষের কথা বলা বামদের এখন করুণ দশা। কিন্তু কেন? গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বামেদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই খরা কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল লাল ঝান্ডা। কিন্তু ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, বামেদের সেই প্রত্যাশার বেলুন অনেকটাই চুপসে গিয়েছে।
যদিও মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্রে মহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমানের এগিয়ে থাকা বাম শিবিরের জন্য যৎসামান্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, তবে সামগ্রিক চিত্রটি সেই তিমিরেই রয়ে গেল। সামাজিক মাধ্যমে বামেদের যে বিপুল প্রচার আর উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, তা বুথ স্তরে ভোট টানতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বামেদের এই বিপর্যয়ের তালিকায় প্রথমেই উঠে আসছে মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নাম। সিপিএমের এই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যকে ঘিরে যুবসমাজের মধ্যে বিপুল উন্মাদনা থাকলেও ভোটের লড়াইয়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ছেড়ে এবার তিনি হুগলির উত্তরপাড়া কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও ভাগ্য ফেরেনি তার। নির্বাচনের ট্রেন্ড অনুযায়ী, তৃণমূল ও বিজেপির শক্ত লড়াইয়ের মাঝে মিনাক্ষী তৃতীয় স্থানেই আটকে রয়েছেন। ফলে আরও একবার এই ‘তরুণ তুর্কি’ নেত্রীর বিধানসভায় যাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।
একই করুণ দশা হয়েছে অভিজ্ঞ আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের। কলকাতার প্রাক্তন মেয়রকে এবার তার পুরনো দুর্গ যাদবপুর থেকে প্রার্থী করেছিল দল। অতীতে এই কেন্দ্রটি বামেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও, এবারের নির্বাচনে বিকাশরঞ্জনকে তৃতীয় স্থানে নামিয়ে দিয়েছেন ভোটাররা। তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক দেবব্রত মজুমদারের দাপটের কাছে বিকাশরঞ্জনের আইনি লড়াইয়ের ইমেজ শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। লোকসভা ভোটের মতো বিধানসভাতেও যাদবপুরের মানুষ বামেদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
দমদম উত্তর কেন্দ্রে সিপিএমের অন্যতম বাজি ছিলেন দীপ্সিতা ধর। জেএনইউ-এর সাবেক এবং এসএফআই-এর পরিচিত মুখ দীপ্সিতাকে ঘিরে অনেক আশা ছিল আলিমুদ্দিনের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাবিনেট মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে তাকে লড়াইয়ে নামানো হয়েছিল। কিন্তু প্রচারের ময়দানে যে তেজ দীপ্সিতা দেখিয়েছিলেন, ভোটের বাক্সে তার লেশমাত্র দেখা যায়নি। বালির পর এবার দমদমেও হারের স্বাদ পেতে হলো তাকে। ফলে রাজপথের আন্দোলনে সোচ্চার এই ছাত্রনেত্রীকে বিধানসভার অলিন্দে দেখার অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হলো।
আরজি কর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পানিহাটি থেকে কলতান দাশগুপ্তের প্রার্থী হওয়া ছিল বামেদের এক বড় রাজনৈতিক চাল। আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে কলতান সাধারণ মানুষের নজর কাড়লেও, নির্বাচনী ময়দানে সেই আবেগকে ভোটে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি। এই কেন্দ্রে আরজি করের নির্যাতিতার মা-কে প্রার্থী করে বিজেপি এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছিল, যার ফলে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। ফলে তরুণ নেতা কলতানকেও তালিকার তৃতীয় স্থানে থেকেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
পুরনো নেতা এবং মন্ত্রীদের ফিরিয়ে এনেও খুব একটা লাভ হয়নি বামফ্রন্টের। কামারহাটিতে মানস মুখোপাধ্যায় কিংবা রাজারহাট-নিউটাউনে গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষি দেব; কেউই তৃণমূলের জয়রথ থামাতে পারেননি। এমনকি একসময়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী দেবলীনা হেমব্রমকেও বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। সাঁওতালি ভাষায় বক্তৃতার মাধ্যমে যিনি ব্রিগেডের মাঠ কাঁপিয়েছিলেন, তাকেও নিজের পুরনো কেন্দ্রে হারের মুখ দেখতে হয়েছে। ফলে অভিজ্ঞ এবং নতুন প্রজন্মের সংমিশ্রণে যে ফল বামেরা আশা করেছিল, তা কার্যত অধরা থেকে গেল।
এবারের নির্বাচনে বামফ্রন্ট শরিকদের নিয়ে ২৫২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, যা গত দুই নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, অধিকাংশ আসনেই তাদের জামানত হারানোর দশা। বিজেপির উত্থানের পর থেকে বামেদের ভোট যে হারে কমেছে, তা পুনরুদ্ধারে এবারের ‘স্টার’ প্রার্থীরাও ব্যর্থ হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে বামেদের যে প্রচারকে বিরোধীরা ‘ফেসবুক বিপ্লব’ বলে কটাক্ষ করত, নির্বাচনী ফলাফল যেন সেই তকমাকেই আরও একবার প্রতিষ্ঠিত করল।
তবে, এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে ডোমকল। মুর্শিদাবাদের এই আসনে মহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমানের জয় বামেদের জন্য ‘মুখরক্ষা’র শামিল। গত পাঁচ বছর বিধানসভা ছিল ‘বামশূন্য’, সেই কলঙ্ক এবার ঘুচতে চলেছে একটি মাত্র আসনের সৌজন্যে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে যেখানে তিন দশক বামেরা শাসন করেছে, সেখানে একটি আসন পাওয়া তাদের রাজনৈতিক পতনেরই করুণ ইঙ্গিত দেয়।

