ভারত সফরে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট, আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

0
ভারত সফরে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট, আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এক আনুষ্ঠানিক সফরে শনিবার ভারতে গেছেন মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর। পাঁচ দিনের এ সফরে প্রেসিডেন্ট হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করবেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সফরের শুরুতে তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের গয়ায় পৌঁছে মহাবোধি মন্দির পরিদর্শন করেন। এরপর তার দিল্লিতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

বিহারের গয়া বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান বিহারের রাজ্যপাল সায়েদ আতা হাসনাইন। 

মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সফরে রয়েছেন কয়েকজন মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ জুন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া, তিনি একটি ব্যবসায়িক ফোরামেও অংশ নেবেন।

২ জুন তিনি মুম্বাই সফর করবেন। সেখানে ব্যবসা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই সফরে সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, মিয়ানমার ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এবং ‘মহাসাগর’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়াই এই সফরের মূল লক্ষ্য।

এদিকে, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের পাঁচ দিনের ভারত সফরকে ঘিরে এশিয়াজুড়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।  হ্লাইংয়ের এই সফর ভারত ও মিয়ানমারের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

ভারতীয় গণমাধ্যম চ্যানেল-১৮ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে চায় মিয়ানমার। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায় ভারত।

চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের আগ্রহ

এই সফরের অন্যতম প্রধান কারণ হলো চীন। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অংশীদার বেইজিঙ। দেশটি মিয়ানমারের অবকাঠামো, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

ভারত মনে করে, অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ। তাই বাণিজ্য, অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) নিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী নয়াদিল্লি। মিয়ানমারে প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত এই খনিজের বড় মজুত রয়েছ। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির গুরুত্ব বাড়ছে।

নিরাপত্তা সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। তাই দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী অতীতে মিয়ানমারের ভেতরের এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে অস্ত্র পাচার, সীমান্তবর্তী সশস্ত্র তৎপরতা এবং শরণার্থী প্রবাহ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখা নয়াদিল্লির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে চায় মিয়ানমার

এই সফর মিয়ানমারের জন্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক সমালোচনা, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ে দেশটি। অনেক পশ্চিমা দেশ মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেয়। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আশিয়ানও দেশটির সামরিক শাসকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ সীমিত করে।

ভারত সফরের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং দেখাতে চাইছেন রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও মিয়ানমার এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের কৌশলের অংশ এই সফর।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো প্রকল্পে নতুন গতি

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্প রয়েছে।

এর মধ্যে কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রজেক্ট এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে এই সফরে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা, যাতে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়।

তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হয়ে গেছে। সফরের সময় উভয় দেশ এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

এই সফরের গুরুত্ব শুধু ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মিয়ানমারের জন্য ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানে কৌশলগত বিকল্প বাড়ানো এবং কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়ে ভারতও নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

চীন, আসিয়ান এবং পশ্চিমা দেশগুলোও এই সফরের দিকে গভীর নজর রাখছে। কারণ এটি এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ভারত-মিয়ানমার সম্পর্ক ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এই সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ছে।

তথ্যসূত্র : দ্য হিন্দু  চ্যানেল-১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here