বিশ্ববাজারে কমছে জ্বালানি তেলের দাম, প্রাণ ফিরেছে শেয়ার বাজারে

0
বিশ্ববাজারে কমছে জ্বালানি তেলের দাম, প্রাণ ফিরেছে শেয়ার বাজারে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। আর এতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে শেয়ারবাজার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা হ্রাসের একটি জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনঃরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় এই সমঝোতার কথা নিশ্চিত করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।

জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ৯৪.৮০ ডলারে নেমে এসেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি কমে ৯৫.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও বর্তমান এই দাম যুদ্ধ শুরুর আগের ৭০ ডলারের তুলনায় এখনও বেশ চড়া, তবুও তেলের দামের এই আকস্মিক পতন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।

শেয়ারবাজারের চিত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপের প্রধান বাজারগুলো খোলার পরপরই লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক ২.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফ্রান্স ও জার্মানির শেয়ারবাজারেও ৫ শতাংশ পর্যন্ত উল্লম্ফন দেখা গেছে। এর আগে এশিয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাজারগুলোতেও তেজি ভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল। জাপানের নিক্কেই ২২৫ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির এই খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে।

এই চুক্তির পটভূমি তৈরি হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি চরমপত্রের মাধ্যমে। তিনি ইরানকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে সমঝোতায় না পৌঁছালে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে আলফাসেন্সের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে থাকলে আমেরিকার নিজের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতো, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলত। মূলত অর্থনৈতিক এই চাপ এড়াতেই যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা স্থগিত রেখে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়ার শর্তে এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকেও এই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, যদি ইরানের ওপর হামলা বন্ধ থাকে তবে তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে। গত কয়েক সপ্তাহে ভারত, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো এশীয় দেশগুলো তাদের জাহাজের জন্য বিশেষ সমঝোতার মাধ্যমে যাতায়াত চালু রাখলেও সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ছিল সীমিত। এখন এই চুক্তির ফলে কয়েকশ আটকা পড়া তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এমএসটি মারকিউ-এর বিশ্লেষক সল কাভোনিক জানান, স্থায়ী শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলের শিল্প স্থাপনার যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হতে পারে এবং এতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব আক্রান্ত হওয়ায় বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এশীয় দেশগুলো এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ধকল সহ্য করেছে। ফিলিপাইন তাদের জ্বালানি চাহিদার ৯৮ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, যার ফলে দেশটি ইতোমধ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। আকাশপথের যোগাযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারণ জ্বালানির দাম বাড়ায় অনেক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজস্ব রিফাইনারি বা পর্যাপ্ত তেল মজুত না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here