আফ্রিকান ফুটবল গত অর্ধশতকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিজের ছাপ রেখে গেছে। রজার মিলা, জে-জে ওকোচা, স্যামুয়েল ইতো কিংবা আসামোয়া জিয়ান- কিংবদন্তির এই তালিকা বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার উত্থানের সাক্ষী।
সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর সেমি-ফাইনাল যাত্রা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকান ফুটবল এখন আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব শক্তি। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে তাই নজর নতুন প্রজন্মের তারকাদের দিকে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় হতে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপে খেলবে রেকর্ড ১০টি আফ্রিকান দল। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে যারা এরই মধ্যে নিজেদের প্রমাণ করেছেন, তাদের অনেকেই এবার বিশ্বমঞ্চ কাঁপানোর অপেক্ষায়।
লাইল ফস্টার (দক্ষিণ আফ্রিকা)
শারীরিক শক্তি, নিরলস প্রেসিং ও বক্সের ভেতরে বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট- তিন গুণেই আলাদা লাইল ফস্টার। বার্নলির এই স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে দারুণ দক্ষ। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন। অরল্যান্ডো পাইরেটস থেকে উঠে আসা ফস্টারের সামনে বিশ্বকাপ হতে পারে নিজেকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার আদর্শ মঞ্চ।
ব্রাহিম দিয়াজ (মরক্কো)
স্পেনে জন্ম হলেও জাতীয় দলের জন্য মরক্কোকে বেছে নিয়েছেন ব্রাহিম দিয়াজ। তবে সেটি ঘোষণায় কিছুটা দেরি করে ফেলায় ২০২২ বিশ্বকাপের রূপকথার অংশ হতে পারেননি তিনি। খুব অল্প সময়েই অবশ্য অ্যাটলাস লায়ন্সের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হয়েছেন। গত বছর আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তিনি করেছেন ৫ গোল।
আক্রমণভাগের প্রায় সব পজিশনেই খেলতে পারেন তিনি। বল পায়ে তার সৃজনশীলতা আলাদা মাত্রা যোগ করে। রিয়াল মাদ্রিদে বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়া হোক কিংবা শুরুর একাদশে জটিল ট্যাকটিক্যাল ভূমিকা- সব জায়গাতেই নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন দিয়াজ।
আমাদ দিয়ালো (আইভরি কোস্ট)
ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢোকা, নিখুঁত বাঁ পায়ের শট আর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা- বেশ ভয়ঙ্কর করে তুলেছে আমাদ দিয়ালোকে। তবে ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে তিন গোল করলেও দলকে কোয়ার্টার-ফাইনালের বেশি এগিয়ে নিতে পারেননি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি এখন আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গোল-অ্যাসিস্টের পাশাপাশি ডিফেন্সিভ ওয়ার্ক রেটও তাকে আলাদা করে তোলে।
হেনিবাল মেজব্রি (তিউনিসিয়া)
মিডফিল্ডে চাপের মধ্যে বল ধরে রাখা ও নিখুঁত পাসে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতায় অনন্য হ্যানিবাল মেজব্রি। মূলত প্লে-মেকার হলেও মাঝমাঠের একাধিক ভূমিকায় খেলতে পারেন তিনি। তিউনিসিয়ার বিল্ড-আপে বাড়তি বৈচিত্র্য যোগ করে তার উপস্থিতি। একসময় ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেললেও ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য তিউনিসিয়াকেই বেছে নেন মেজব্রি।
মোহামেদ সালাহ (মিশর)
গত ৯ বছরে লিভারপুল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন মোহামেস সালাহ। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, দুইটি প্রিমিয়ার লিগ, চারটি গোল্ডেন বুট- ক্লাবটির হয়ে তার সাফল্যের তালিকা দীর্ঘ। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে তার দায়িত্ব আরও বড়। ৩৩ বছর বয়সেও আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। মাঠে যেমন, ড্রেসিংরুমেও নেতৃত্ব দেন সালাহ। উত্তর আমেরিকায় মিশরীয় সমর্থকদের সবচেয়ে বড় আশার নামও তিনিই।
সিডনি লোপেস কাবরাল (কেপ ভার্দে)
পর্তুগিজ ক্লাব এসত্রেলা আমাদোরায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর জানুয়ারিতে সিডনি লোপেস কারবালকে দলে ভেড়ায় বেনফিকা। দুই পায়েই সমান দক্ষ হওয়ায় ডান-বাম দুই প্রান্তেই কার্যকর সিডনি লোপেস। ফুল-ব্যাক, উইঙ্গার কিংবা উইং-ব্যাক- সব ভূমিকায় মানিয়ে নিতে পারেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দ্রুতই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
সাদিও মানে (সেনেগাল)
ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরবে গেলেও সেনেগালের হয়ে সাদিও মানের প্রভাব এতটুকু কমেনি। বরং এখন তিনি দলের আরও বড় নেতা। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পাঁচ গোল করে লায়ন্স অব তেরাঙ্গাকে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। আল নাসরের হয়েও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন এই ৩৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড।
আমিন গুইরি (আলজেরিয়া)
পরিসংখ্যানের চেয়ে দলীয় খেলায় অবদান রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেন আমিন গুইরি। নিজের আদর্শ করিম বেনজেমার মতো তিনিও বিল্ড-আপে যুক্ত থাকতে পছন্দ করেন। তাতে অবশ্য গোল করার ক্ষমতা কমে যায়নি। অলিম্পিক মার্শেইর হয়ে নিয়মিত গোল ও অ্যাসিস্ট করছেন তিনি। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেললেও পরে আলজেরিয়াকে বেছে নেওয়া গুইরি এখন মরুভূমির শেয়ালদের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র।
অ্যান্টনিও সেমেনিও (ঘানা)
বোর্নমাউথ থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর অ্যান্টনিও সেমেনিওর খেলায় এসেছে নতুন মাত্রা। আগে যেখানে গতি আর শক্তিই ছিল মূল অস্ত্র, এখন তিনি নিয়ন্ত্রিত ও টেম্পো-ভিত্তিক ফুটবলেও মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। আক্রমণের একাধিক পজিশনে খেলতে পারার সামর্থ্য তাকে ঘানার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সেড্রিক বাকাম্বু (কঙ্গো ডিআর)
সেড্রিক বাকাম্বুর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় বক্সের ভেতরে তার মুভমেন্টে। খুব বেশি জায়গা লাগে না, কখন কোথায় থাকতে হবে- সেটা তিনি জানেন স্বভাবগতভাবেই। ফ্রান্স, চীন, তুরস্ক ও স্পেন- বিভিন্ন দেশে খেলার অভিজ্ঞতায় তার গোল করার প্রবৃত্তি আরও শাণিত হয়েছে। রিয়াল বেটিসের এই স্ট্রাইকার ৩৫ বছর বয়সেও কঙ্গো ডিআরকে বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে আফ্রিকার ফুটবল এখন আর শুধু আবেগের গল্প নয়, প্রতিযোগিতারও অন্য নাম। ২০২৬ বিশ্বকাপে হয়তো আবার জন্ম নেবে নতুন কোনো রজার মিল্লা, নতুন কোনো ওকোচা। আর সেই অপেক্ষাতেই এখন ফুটবল বিশ্ব।

