বিপুল বিনিয়োগেও বিশ্বকাপে ব্যর্থ উপসাগরীয় দেশগুলো

0
বিপুল বিনিয়োগেও বিশ্বকাপে ব্যর্থ উপসাগরীয় দেশগুলো

বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়েছে সৌদি আরব ও কাতার। উপসাগরীয় এই দুটি দেশের ফুটবল ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও কাঙিক্ষত সাফল্য দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কেবল প্রচুর অর্থ থাকলেই সাফল্যের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

গত বছরের এবারও সৌদি আরব নকআউটে যেতে পারেনি। অথচ এ গ্রুপ থেকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে রীতিমতো চমক দিয়েছে নকআউট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দে।

সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও করিম বেনজেমার মতো তারকাদের দলে ভেড়ানোর বিশাল এক উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি আরব ক্লাব ফুটবলের দৃশ্যপট ওলটপালট করে দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—বিশেষ করে ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে—তাদের এখনও অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

চার বছর আগে আয়োজক দেশ হিসেবে অংশ নেওয়া কাতারও মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেই বিদায় নিয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দুই দেশ ইরান ও ইরাকেরও। এই বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর ১০টির মধ্যে ৯টি দল নকআউট নিশ্চিত করেছে। এর বিপরীতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ছাপ রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ফলে ১৯৯৪ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সৌদি আরবের আশা শেষ হয়ে যায়। সৌদি কোচ জর্জিওস দনিস বলেন, আমরা এমনটা চাইনি, কারণ আমাদের সমমানের একটি দলের বিপক্ষে ম্যাচে আমাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। তাই বিষয়টি উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে শেষ মুহূর্তে গোল করে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জনের মাধ্যমে কাতার ইতিহাস গড়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নিজেদের মাটিতে আয়োজিত টুর্নামেন্টে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই বিদায় নেওয়ার পর, এটি ছিল আরেকটি হতাশাজনক ও দ্রুত বিদায়ের ঘটনা।

কোচ জুলেন লোপেতেগুই বলেন, আমার মনে হয় তারা প্রমাণ করেছে, অন্তত এ ধরনের ম্যাচে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম। স্পেন ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ লোপেতেগুইয়ের নিয়োগই প্রমাণ করে, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পারফরম্যান্স উন্নত করতে কাতার কী ধরনের বিনিয়োগ করেছে।

সৌদি আরবের মতো তারা ইউরোপের বয়োজ্যেষ্ঠ তারকাদের নিজেদের ঘরোয়া লিগে ভেড়ানোর মতো কোনো সাহসী উদ্যোগ নেয়নি। মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যা এবং প্রায় ৩ লাখ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও, তারা এমন সব স্থানীয় খেলোয়াড় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা দুবার এশিয়ান কাপ জিতেছে এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোর উপস্থিতিতেও ওই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে।

কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারেনি। টুর্নামেন্ট আয়োজন এবং আটটি অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এমন দ্রুত বিদায় তাই হতাশার জন্ম দিয়েছে।

লোপেতেগুই বলেন, অন্য দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে, আমরা অবশ্যই জানি আমাদের অবস্থান কী। তবে একই সঙ্গে আমি মনে করি, এটি একটি ছোট দেশ হলেও এখানে রয়েছে প্রবল আবেগ ও বিশাল বিনিয়োগ। আমাদের প্রতিদিন উন্নতি করতে হবে এবং তারা তা করেছেই। আমরা নিশ্চিতভাবেই আশাবাদ নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি।

২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার পর সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও এখন মূল মনোযোগ ভবিষ্যতের ওপরই নিবদ্ধ। বিশ্বজুড়ে খেলাধুলার জগতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসল কেনা, ‘লিভ গলফ’ চালু করা এবং বিশ্বমানের বক্সিং ও ফর্মুলা ১-এর মতো ইভেন্ট আয়োজন করা। তেলের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমিয়ে আয়ের নতুন উৎস খোঁজার প্রচেষ্টা তারা চালাচ্ছে, তাতে বিশ্বকাপ আয়োজন হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

তারা চায় ঘরের মাঠে আয়োজিত টুর্নামেন্টে তাদের জাতীয় দল যেন নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়। রোনালদোর মতো সুপারস্টারদের দলে ভেড়ানোর ফলে যেমন তাদের লিগের পরিচিতি বেড়েছে। তেমনি আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে খেলার মানও উন্নত হবে।

অথচ চার বছর আগে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটন ঘটানোর পর, এবার তাদের পারফরম্যান্সে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত দেখা যায়নি—বরং টানা ষষ্ঠবারের মতো তারা গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়েছে।

ডনিস বলেন, আরব লিগে যখন এমন সব তারকা খেলোয়াড় খেলেন, তখন প্রতিযোগিতা যত তীব্র হয়, আমাদের খেলোয়াড়রাও ততটাই ভালো হয়ে ওঠেন। তবে জাতীয় দলের হয়ে খেলার বিষয়টি ভিন্ন, কারণ জাতীয় দলে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য বিশেষ এক মানসিকতার প্রয়োজন হয়।

বিদেশি তারকা খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ানোর হার কমেছে এবং নেইমারের মতো বড় বড় নাম ইতোমধ্যে চলে গেছে। সৌদি আরবে প্রতিভা বিকাশের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইউএস সকারের স্পোর্টিং ডিরেক্টর ম্যাট ক্রকারকে নিয়ে আসা হয়েছে এবং গত তিন বছরে যুব পর্যায়ে বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে সৌদি আরব ও কাতার যেখানে ক্রীড়াজগতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, সেখানে ইরান ১৯৭৮ সাল থেকেই বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের জেরে প্রস্তুতি ও যাতায়াত সংক্রান্ত নানা জটিলতার মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের। এরপরও তিনটি ম্যাচ ড্র করার সুবাদে ‘সেরা তৃতীয় দল’ হিসেবে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। বিশ্বকাপে সাতবার অংশ নিলেও তারা কখনোই গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।

৪০ বছরের ব্যবধানে দুবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ইরাকের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৪৮ দলের বিশাল পরিসরের বিশ্বকাপে যখন কেপ ভার্দে বা কঙ্গোর মতো দেশগুলোর ইতিহাস গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তখন উপসাগরীয় দেশগুলো এখনও তাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here