একদিকে যখন দিল্লির অভিজাত জিমখানা ক্লাবের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা আর ক্ষমতার অন্দরমহল নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই মুম্বাইয়ের বাতাসে ভাসছে রণবীর সিংয়ের ‘ডন ৩’ থেকে সরে দাঁড়ানোর খবর। তবে কোনো হইচই বা কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, রণবীর কেবল একটি পরিমাপিত বিবৃতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে চুপচাপ পুরো বলিউডের তোলপাড় দেখছেন। লেখক ও কলামিস্ট শোভা দে সম্প্রতি এই দুই ভিন্ন মেরুর ঘটনাকে এক সুতোয় বেঁধে একটি চমকপ্রদ মন্তব্য করেছেন। তিনি রণবীর সিংকে বলিউডের ‘দিল্লি জিমখানা’ বলে অভিহিত করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই তুলনা অদ্ভুত মনে হলেও, একটু গভীরভাবে ভাবলে এর ভেতরের অন্তর্নিহিত সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দিল্লি জিমখানা ক্লাব কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি মূলত আভিজাত্য, বংশমর্যাদা এবং ক্ষমতার এক অলিখিত প্রতীক। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবের সদস্যপদ পাওয়াটা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। সেখানে টাকা থাকলেই প্রবেশাধিকার মেলে না, প্রয়োজন হয় নেটওয়ার্ক ও প্রভাবের। সাম্প্রতিক সময়ে এই শতবর্ষী ক্লাবটিকে জমি খালি করার সরকারি নির্দেশ এবং তা নিয়ে আইনি লড়াই ক্ষমতার এক নতুন দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই শোভা দে যুক্ত করেছেন রণবীর সিংয়ের প্রসঙ্গ। ‘ডন ৩’ থেকে রণবীরের আকস্মিক প্রস্থান এবং এর পরপরই ‘এফডব্লিউআইসিই’ কর্তৃক তার বিরুদ্ধে অসহযোগিতার যে নির্দেশ জারি করা হয়েছে, শোভা দে এই দুটি বিষয়কেই মূলত ক্ষমতা প্রদর্শন, নিয়ন্ত্রণ এবং কাউকে ‘তার জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার’ এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা হিসেবে দেখছেন।
রণবীর সিং বলিউডে সব সময়ই এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। তার অতি-নাটকীয়তা, পোশাকের বৈচিত্র্য এবং দুর্দান্ত অভিনয়দক্ষতা তাকে আর পাঁচটা সাধারণ তারকার চেয়ে আলাদা করেছে। সিনেমাজগতে যেখানে তারকাদের সহজেই বদলে ফেলা হয়, সেখানে রণবীরের ‘ডন ৩’ থেকে সরে যাওয়াটা গোটা ইন্ডাস্ট্রির অহমে আঘাত করেছে। সাধারণত কোনো সিনেমা আটকে গেলে কেবল বড় তারকারাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, তার পেছনে থাকা প্রযুক্তিবিদ, স্পট বয় এবং ক্রুদের রুজি-রুটিতে টান পড়ে। কিন্তু এই পুরো বিতর্কের মাঝে রণবীরের নীরবতা সবাইকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করে কিংবা কোনো টেলিভিশন প্যানেলে আত্মপক্ষ সমর্থন না করে তিনি এক অদ্ভুত স্ট্র্যাটেজিক নীরবতা বজায় রেখেছেন। আর এই নীরবতাই যেন তার রহস্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আসলে পর্দার ‘ডন’ চরিত্রের সঙ্গেই মিলে যায়। আসল ডন যেমন কখনো প্রকাশ্যে আতঙ্কিত হয় না, বরং আড়ালে থেকে সব হিসাব কষে, রণবীরও যেন ঠিক তাই করছেন।
বলিউড বিশ্লেষকদের মতে, ‘ধুরন্ধর’ সিনেমার বিপুল সাফল্যের পর রণবীর সিংয়ের মনস্তত্ত্বে এক বড় বদল এসেছে। তিনি এখন আর শুধু ইন্ডাস্ট্রির গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য মরিয়া নন, বরং নিজের অবস্থান ধরে রাখতে এবং দেখেশুনে পা ফেলতে পছন্দ করছেন। ‘ডন ৩’ এর চিত্রনাট্যের অন্ধকার দিক, বারবার শিডিউল পরিবর্তন এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্লান্তি—কারণ যা-ই হোক না কেন, রণবীর এখন নিজের শর্তে যুদ্ধ বেছে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ‘ডন ৩’ সিনেমাটি যেন নিজেই এক অফস্ক্রিন থ্রিলারে পরিণত হয়েছে। প্রথমে শাহরুখ খানের বিদায়, তারপর রণবীরের প্রবেশ ও পরবর্তীতে প্রস্থান, আর এখন নতুন ডনের খোঁজে সামাজিক মাধ্যমে নানা জল্পনা—সব মিলিয়ে নির্মাতা ফারহান আখতার নিজেই যেন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়েছেন।
শোভা দে-র এই উপমাটি আসলে আধুনিক ভারতের ক্ষমতা এবং প্রথা ভাঙার এক চমৎকার উদাহরণ। দিল্লি জিমখানা যেখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে, সেখানে রণবীর সিং এমন এক নতুন যুগের তারকা, যিনি কোনো বাঁধাধরা নিয়ম মানতে নারাজ। সুটেড-বুটেড হয়ে কেবল সংলাপ দেওয়াই ডন হওয়া নয়; জুয়ার টেবিলে যখন সবাই খেলা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তখন সেখান থেকে শান্তভাবে উঠে হেঁটে চলে যাওয়াটাই আসল ডন সুলভ আচরণ। আর রণবীর সিং ঠিক এই মুহূর্তে সেটাই করে দেখিয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি

