জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বাণিজ্যিক পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তির উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে সিঙ্গাপুরের গবেষণা সংস্থা এস্টার এবং বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ফিউশন প্রতিষ্ঠান কমনওয়েলথ ফিউশন সিস্টেমস (সিএফএস)। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত টেমাসেক-এর ইকোসপার্টি সম্মেলনে পাঁচ বছর মেয়াদী এই কৌশলগত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো গ্লোবাল ফিউশন এনার্জি সাপ্লাই চেইনে সিঙ্গাপুরকে একটি অগ্রগামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
চুক্তি অনুযায়ী সিঙ্গাপুরের এই সরকারি বোর্ড মার্কিন প্রতিষ্ঠান সিএফএস-এর তৈরি ‘এআরসি’ ফিউশন রিয়্যাক্টরের বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। কম খরচে ও সহজে ব্যবহারযোগ্য এই রিয়্যাক্টরটি ২০৩০ সালের শুরুর দিকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ডেটা সেন্টার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো উচ্চ বিদ্যুৎ-চাহিদাসম্পন্ন প্রযুক্তির কারণে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সূর্য যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে, সেই একই পদ্ধতি তথা ফিউশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিভিন্ন স্টার্ট-আপ ও সরকার। প্রচলিত ফিশন রিয়্যাক্টরের তুলনায় ফিউশন প্রযুক্তি অনেক বেশি নিরাপদ। কারণ, এতে অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিস্ফোরণের কোনো ঝুঁকি থাকে না। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়।
এস্টারের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক লিম কেং হুই জানান, ফিউশন এনার্জি খাতটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং বিশ্বব্যাপী এই শিল্পটি নির্ভরযোগ্য ক্লিন পাওয়ার সরবরাহের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এস্টার উন্নত সামগ্রী ও সুনির্দিষ্ট উৎপাদন খাতের দক্ষতা বাস্তবমুখী ফিউশন সিস্টেমে প্রয়োগ করতে পারবে। এই উদ্যোগের পূর্বে এস্টার, সিএফএস এবং এসটি ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথভাবে ‘স্পার্ক’ নামক একটি প্রদর্শনীর যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ শুরু করেছিল। এটি ২০২৭ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় শক্তির চেয়ে বেশি ফিউশন শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে এই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে। প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়া এবং সিঙ্গাপুরের টেমাসেক সমর্থিত এই সিএফএস প্রকল্পে গুগল ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেক কিনে নেওয়ার চুক্তিও সম্পন্ন করেছে। সিএফএস-এর প্রধান নির্বাহী বব মামগার্ড বলেন, সিঙ্গাপুরের উন্নত উৎপাদন এবং মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে। যা তারা ইতিমধ্যে জাহাজ নির্মাণ, মহাকাশ এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রমাণ করেছে। এই যৌথ উদ্যোগ তাদের বাণিজ্যিক যাত্রাকে আরও গতিশীল করবে।
পারমাণবিক শক্তির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে নিরাপদ পারমাণবিক শক্তি মোতায়েনে সহযোগিতা করার জন্য সম্প্রতি ‘গ্লোবাল কোয়ালিশন ফর নিউক্লিয়ার ফিলানথ্রপি’ নামে একটি জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। টেমাসেক ট্রাস্ট এবং রকফেলার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গঠিত এই জোটের লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত পারমাণবিক শক্তির বিকাশ ঘটানো। এই জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওপেনহাইমার প্রজেক্টের মতো অলাভজনক সংস্থাও। ওপেনহাইমার প্রজেক্টের সহ-নির্বাহী পরিচালক কারেন পাক জানান, সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইরান সংঘাতের পর জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে। এমনকি বিশ্বব্যাংকও ২০২৫ সালের জুনে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যা স্পষ্ট করে যে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা কতটা অপরিসীম।

