প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেছেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সইয়ে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এর মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দুই দেশ। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মাত্র ১৮ ঘণ্টার সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি চীনের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে শাংগ্রি লা হোটেলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়ে দুই রাষ্ট্রনায়ক আলোচনা করেন। দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একইসঙ্গে হালাল শিল্প ও হালাল ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে হালাল পণ্য, সনদ প্রদান ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন।
তিনি জানান, বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে, বিশেষ করে প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাদের ইতিবাচক অবদানকে উভয় দেশ স্বীকৃতি দেয়। দুই দেশের সরকারপ্রধান শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে একমত পোষণ করেন। একইসঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন উভয় সরকার প্রধান।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেলিগেশন মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন। পরে মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকসমূহে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও মতবিনিময় করা হয়।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন এবং তার হাত ধরেই বাংলাদেশ থেকে এখানে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াও প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে মালয়েশিয়া সফর করেন এবং এখানকার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিক বাংলাদেশে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তার বিদেশ সফর শুরু করলেন এই দেশ থেকে।
মাহদী আমিন বলেন, বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ আছে। এই সফরে পুনরায় শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিবাসনে ব্যয় কমানো, প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে একমত হয়েছেন মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া, মালয়েশিয়ার আইনি কাঠামোর ভেতরে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে আনোয়ার ইব্রাহিমকে আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান।
শ্রমবাজারের জন্য সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমবাজার বন্ধের সঙ্গে বিএনপির কোনও সম্পৃক্ততা কখনই ছিল না। যতবার বিএনপি সরকারে এসেছে, ততবারই বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ হয়েছে।
জ্বালানি খাতে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে মালয়েশিয়ার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া ও এমএমসি পোর্টের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সব মিলিয়ে এ সফর দুই দেশের সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মাহদী আমিন আরও জানান, সস্ত্রীক মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রেস টিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা।

