বাংলাদেশে শাখা খুলতে চায় জাপানের এমইউএফজি ব্যাংক

0
বাংলাদেশে শাখা খুলতে চায় জাপানের এমইউএফজি ব্যাংক

বাংলাদেশে একটি শাখা স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি ব্যাংক। তবে একইসঙ্গে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।

এমইউএফজি ব্যাংক হলো মিতসুবিশি ইউএফজে ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের (এমইউএফজি) প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এটি জাপানের বৃহত্তম ব্যাংকিং গ্রুপ এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্যাংকটির সদর দফতর টোকিওতে। জাপানের বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে গ্রুপটি গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাখাতে বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি গড়ে তুলেছে।

গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যাংকটির একটি প্রতিনিধি দল।

প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন— এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের (এপ্যাক) প্রধান নির্বাহী ইউকিনোবু সায়েকি, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান ওসামু আবে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিকল্পনা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট সোতারো ইতো, এমইউএফজি ঢাকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান প্রতিনিধি কেঞ্জি কিমুরা এবং এমইউএফজি ঢাকার ভাইস প্রেসিডেন্ট (এফআই) গোলাম কিবরিয়া।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ১৯৯০ সাল থেকে এমইউএফজি ঢাকায় একটি প্রতিনিধি অফিস পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে তারা বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এমইউএফজি ব্যাংকের ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং ভিয়েতনামে শাখাভিত্তিক কার্যক্রম রয়েছে।

এমইউএফজি ব্যাংক বাংলাদেশে ‘করিডোর ব্যাংকিং’ মডেলে কাজ করতে চায়। করিডোর ব্যাংকিং হলো এমন একটি ব্যাংকিং মডেল যেখানে একটি দেশের ব্যাংক অন্য একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সাথে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং তহবিল প্রবাহ সহজ করার জন্য বিশেষায়িত আর্থিক সেবা প্রদান করে। মূলত, এটি দুটি অর্থনীতির মধ্যে একটি আর্থিক সেতু বা ‘করিডোর’ তৈরি করে।

বাণিজ্য অর্থায়নে উন্নতির প্রত্যাশা

বাংলাদেশে এমইউএফজি ব্যাংক শাখা স্থাপন করলে এখানে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট ঋণ, বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত ব্যাংকিং সেবাগুলো আরও সহজলভ্য ও কার্যকর হয়ে উঠবে। এর ফলে দেশে জাপানি বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত পরিচিত ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে এমইউএফজি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করলে জাপানি কোম্পানিগুলো এখানে বিনিয়োগে আরও বেশি আগ্রহী হতে পারে। এছাড়া, আমদানি ও রফতানিকারকদের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অন্যান্য ট্রেড ফাইন্যান্স সুবিধাগুলো আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে; যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের খরচ ও সময় উভয়ই কমিয়ে আনবে।

ওই কর্মকর্তা আরওবলেন, এমইউএফজির একটি শাখা স্থাপিত হলে বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে আরও বেশি জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারী দেশে সম্ভাবনাময় সুযোগগুলো অনুসন্ধানে উৎসাহিত হতে পারে। একইসঙ্গে বাণিজ্য অর্থায়ন সেবাও আরও সহজলভ্য হবে। 

বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বার্ষিক প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে জাপানে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া, ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করে। আর্থিক সেবাগুলো আরও সহজ ও গতিশীল হলে বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) তাদের আর্থিক লেনদেনের একটি বড় অংশ এমইউএফজি ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করে। বাংলাদেশে এই ব্যাংকের শাখা খুললে জাইকার সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিচালনাগত জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে। এটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য আর্থিক লেনদেন আরও দ্রুত ও সুবিধাজনক করার মাধ্যমে খরচ কমাবে এবং দক্ষতা বাড়াবে।

উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ নিয়ে এমইউএফজি ব্যাংকের উদ্বেগ

জানা গেছে, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক খাতে বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমইউএফজি ব্যাংক। খেলাপি ঋণের ভারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা যে মাত্রায় চাপের মধ্যে রয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে দেশে শাখা স্থাপনের জন্য এটি উপযুক্ত সময় কি না— তা জানতে চেয়েছে ব্যাংকটি। প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চেয়েছে।

প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করে গভর্নর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র কম দেখানো হয়েছে। চলমান অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউয়ের (একিউআর) মাধ্যমে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের আরও সঠিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম। তাই দেশে শাখা খুললে এমইউএফজি ব্যাংক সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। বৈঠকে উপস্থিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গভর্নর খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এমইউএফজির প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, আগামী বছরগুলোতে এ হার কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কেও প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এমইউএফজি ব্যাংককে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপন এবং প্রচলিত ব্যাংকিং সেবায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা দেবে বলে গভর্নর প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here