বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে ‘মাইকেল’, তবে কতটা সত্যের কাছাকাছি

0
বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে ‘মাইকেল’, তবে কতটা সত্যের কাছাকাছি

মাইকেল জ্যাকসন সংগীতের ইতিহাসে এমন এক নাম, যাকে ঘিরে বিস্ময়, ভালোবাসা, বিতর্ক আর রহস্য একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর গান, নাচ, মঞ্চ উপস্থিতি সবকিছুই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সেই কিং অব পপের জীবন এবার উঠে এসেছে বড় পর্দায় অ্যান্টোয়ান ফুকোয়ার চলচ্চিত্র ‘মাইকেল’-এ।

মুক্তির পর থেকেই ছবিটি বক্স অফিসে দারুণ সাড়া ফেলেছে। প্রথম দিনেই উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৩ কোটি ৯৫ লাখ ডলার আয় করে আলোচনায় আসে ছবিটি। প্রথম সপ্তাহান্তে বিশ্বব্যাপী আয় ছাড়িয়ে যায় ২১ কোটি ডলার।

তবে এখানেই থেমে থাকেনি এই সাফল্য। মুক্তির ২০ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে ‘মাইকেল’ ঝড় অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে ছবিটির মোট আয় ৬০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। উত্তর আমেরিকায় এটি এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সংগীতভিত্তিক বায়োপিক, অন্তত মূল্যস্ফীতি সমন্বয় ছাড়া হিসাব করলে। এর আগে শীর্ষে ছিল ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি’।

আইম্যাক্সসহ প্রিমিয়াম স্ক্রিন ফিরে পাওয়ায় নতুন করে গতি পেয়েছে সিনেমাটি। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রে আরও প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করতে পারে ‘মাইকেল’। বিশেষ করে ‘মর্টাল কম্ব্যাট ২’ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে এই বায়োপিক।

ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে জাফার জ্যাকসন। মাইকেল জ্যাকসনের বড় ভাই জার্মেইনের ছেলে তিনি। এই ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হলেও তা বোঝার উপায় নেই।

পুরো ছবিজুড়ে বহু মুহূর্তে মনে হয়েছে, যেন পর্দায় সত্যিই মাইকেল জ্যাকসনকে দেখা যাচ্ছে। হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি কিংবা নাচের স্টেপ সবখানেই জাফারের প্রস্তুতি ও পরিশ্রম স্পষ্ট। বিশেষ করে মঞ্চের দৃশ্যগুলোতে তাঁর উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে দর্শক সহজেই ছবির ভেতরে ঢুকে পড়েন।

শিশু মাইকেলের চরিত্রে জুলিয়ানো ক্রু ভাল্ডিও মনোযোগ কেড়েছেন। আর বাবা জো জ্যাকসনের ভূমিকায় কোলম্যান ডমিঙ্গো শক্তিশালী অভিনয় করলেও চরিত্রটিকে অনেকটাই একমাত্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবির সবচেয়ে উপভোগ্য দিক এর সংগীতায়োজন। মাইকেলের বিখ্যাত গানগুলোর পরিবেশনা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অনেক সময় সিনেমা হলকে কনসার্ট ভেন্যু মনে হয়।

‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’ কিংবা অন্যান্য পরিচিত পারফরম্যান্সের দৃশ্যগুলো দর্শকদের ভেতরে আলাদা উচ্ছ্বাস তৈরি করে। বলা যায়, এই সংগীতনির্ভর আবেগই ছবিটিকে সাধারণ দর্শকের কাছে এতটা গ্রহণযোগ্য করেছে।

পরিচালক অ্যান্টোয়ান ফুকোয়া দৃশ্য নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কনসার্ট ও মঞ্চের দৃশ্যগুলোতে তাঁর পরিকল্পনা চোখে পড়ে। তবে কিছু জায়গায় ক্যামেরার কাজ অতিরিক্ত ব্যস্ত মনে হয়েছে। বিশেষ করে নৃত্যদৃশ্যে কয়েকবার মনে হয়েছে, ক্যামেরা যদি আরও স্থির থাকত, তাহলে পারফরম্যান্সের শক্তি ভালোভাবে ফুটে উঠত।

সব মিলিয়ে ছবিটি দেখতে আকর্ষণীয়, কিন্তু একজন বিশ্বমানের শিল্পীর জীবনীচিত্র হিসেবে যে গভীরতা ও ঝুঁকি নেওয়ার দরকার ছিল, সেখানে নির্মাতারা অনেকটাই নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছেন।

ছবিটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর গল্প বলার ধরন নিয়ে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাইকেলের জীবনের একটি অংশ এখানে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পুরো উপস্থাপনায় তাঁর জীবনের বিতর্কিত ও জটিল অধ্যায়গুলো প্রায় অনুপস্থিত।

ছবিটি দেখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এখানে একজন মানুষকে নয়, বরং একটি কিংবদন্তিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মানসিক টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা পরবর্তী সময়ের বিতর্ক এসব বিষয়কে খুব সতর্কভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এমনকি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সদস্যও ছবিতে অনুপস্থিত। ফলে মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের পূর্ণ ছবি এখানে পাওয়া যায় না।

ছবি শেষ হওয়ার পর মনে হয়, গল্পটা যেন পুরো বলা হলো না। অবশ্য সেটি ইচ্ছাকৃতও হতে পারে, কারণ এর দ্বিতীয় পর্বের পরিকল্পনার কথা ইতোমধ্যেই শোনা যাচ্ছে।

হয়তো পরের পর্বে মাইকেলের জীবনের আরও অন্ধকার, জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলো উঠে আসবে। সেই সাহস নির্মাতারা দেখাতে পারলে তবেই এই বায়োপিক পূর্ণতা পাবে।

শেষ কথা
মাইকেল নিঃসন্দেহে উপভোগ্য একটি ছবি। বিশেষ করে মাইকেল জ্যাকসনের ভক্তদের জন্য এটি আবেগময় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। সংগীত, নাচ আর জাফার জ্যাকসনের অভিনয় ছবিটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তবে যারা মাইকেল জ্যাকসন নামের মানুষটিকে গভীরভাবে জানতে চান, তাঁদের জন্য এই ছবি পুরো উত্তর দেয় না। বরং অনেক প্রশ্নই রেখে যায়।

রেটিং ৩.৫ ৫
সংগীত ও অভিনয়ের জন্য বাড়তি নম্বর। গল্প বলায় আরও সাহস থাকলে ছবিটি অন্য মাত্রা পেতে পারত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here