প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছেন

0
প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছেন

ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স-২০২৬’-এ দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে। শেষ দিনের অধিবেশনে টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সাবেক সভাপতি এ কে আজাদের বক্তব্যে গুরুত্ব পায় দেশের মুক্ত গণমাধ্যমের বিষয়। তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত কার্যক্রম নিয়ে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যতে এগুলো হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও সরকার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান তিনি। 

এসব বিষয়ে এ কে আজাদের বিশেষ সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন : বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স আয়োজনকে আপনি কিভাবে দেখেন?

এ কে আজাদ : এটিকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। মুক্ত গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। আমাদের বোঝাপড়ার চেয়েও তা দ্রুত হচ্ছে।

এমন সময়ে আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় হলে সত্য প্রকাশের সাহসটা বাড়ে। ভবিষ্যতে সংবাদপত্রের জন্য এবং ডিজিটাল মিডিয়ার জন্য এটা আশাব্যঞ্জক। আশা করি, সরকারের জন্যও ভালো হয়েছে। এমন সম্মেলনে সংবাদমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি হয়।

প্রশ্ন : সাংবাদিকতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়েও সম্মেলনে কথা হয়েছে। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে আপনাদের।

এ কে আজাদ : এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নোয়াবের পক্ষ থেকে আমরা সাক্ষাৎ করেছি। সংবাদপত্রের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে।

আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি, অতীতের সরকারের মতো যেন বর্তমান সরকার স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের কথা শুনেছেন। তিনি সংবাদপত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বকেয়া বিল দ্রুত ছাড়ানোর ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন। যেসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার আছেন, তাঁদের জামিনের ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন; এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয় এমন কিছু বর্তমান সরকার করবে না বলে জানিয়েছেন। বর্তমান সরকারের সময়ে এখনো মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ শুরু হয়নি।

তা যেন না হয়, আমরা সে জন্যও অনুরোধ করেছি।
প্রশ্ন : সম্মেলনের আলোচনায়ও সংবাদমাধ্যমে সরকারের হস্তক্ষেপ, মালিকদের ভূমিকা প্রসঙ্গগুলো এসেছে। আপনি নিজেও অনেক খোলামেলা কথা বলেছেন।

এ কে আজাদ : দেখুন, একজন সাংবাদিক তাঁর পেশাদারত্বের জায়গা থেকে দায়বদ্ধ হয়ে সাংবাদিকতা করেন। এর সঙ্গে নীতিনৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ জড়িত বলে মূলধারার প্রতিবেদকরা কখনো তথ্য পেয়েই একটা প্রতিবেদন করে বসেন না; বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সময় যথেষ্ট প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করতে হয়। তখন সব পক্ষের বক্তব্যই শুনতে হয় প্রতিবেদককে। এ সময় দুর্নীতির প্রমাণ যাঁর দিকে যাচ্ছে, তিনি কিন্তু টের পেয়ে যান। তখন শুরু হয় যোগাযোগ। দুর্নীতির প্রমাণ যাঁদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তাঁরা সংবাদমাধ্যমের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। সংবাদটি যাতে ছাপা না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে চান। নিজে না পারলে শুরু হয় ক্ষমতা প্রয়োগ। অতীতে আমরা দেখেছি, অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি দলের লোক হলে সরকারের উচ্চ মহল থেকে, এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাকেও তখন ব্যবহার করার নজির আছে। সাংবাদিক-মালিকের এমন চাপের মুখে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশে সব সরকারের সময়ই ঘটেছে। এসব উদাহরণ টেনেই সম্মেলনে আলোচনা করেছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেও আমরা এসব ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা বলেছি, ভবিষ্যতে যেকোনো প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হলে তথ্য মন্ত্রণালয় যেন গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার না করে সরাসরি মিডিয়া হাউসে দায়িত্বরত প্রধান বা নির্বাহী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রধানমন্ত্রী দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আমরাও আশ্বস্ত হয়ে বলেছি, সৎ সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করলে সরকারই পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।

প্রশ্ন : দুর্নীতির খবর প্রকাশ করা হলে সাংবাদিকের পাশাপাশি মালিকও চাপে পড়েন, এ প্রসঙ্গে আপনি সম্মেলনে কথা বলেছেন। এই চাপ কেমন?

এ কে আজাদ : সংবাদ, গণমাধ্যমের সঙ্গে মালিককে সম্পৃক্ত করাই চাপ। দেখুন, বর্তমান সরকার একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এসেছে। এ জন্য তাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। গণমাধ্যমের সঙ্গে অতীত সরকারের মতো দমনমূলক আচরণ বর্তমান সরকার করবে না, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে—এটাই সবাই প্রত্যাশা করে।

প্রশ্ন : বিশ্বের অনেক দেশে বড় বড় সংবাদপত্র ট্রাস্টের অধীনে চলে। সম্মেলনে আপনার বক্তব্যে আপনার সংবাদপত্র বা টেলিভিশনকে ট্রাস্টের অধীনে দেওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে। বিষয়টি আসলে কী?

এ কে আজাদ : ট্রাস্টের অধীনে নিজের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেওয়ার কোনো চিন্তা আমার ছিল না। তবে সম্মেলনে যখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে কথা হলো, তখন কেউ কেউ বললেন, অনেক বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ফলে কখনো কখনো সংবাদপত্রে আপনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে ট্রাস্টের অধীনে গেলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আরো বাড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছি, যোগ্য নেতৃত্ব পেলে নিজের একটি প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের কাছে ছেড়ে দিতে রাজি আছি।

প্রশ্ন : সম্মেলনে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, স্বাধীন গণমাধ্যম, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের আর্থিক স্বনির্ভরতার মতো অনেক বিষয় আলোচনা হয়েছে। কারা কারা আলোচনা করেছেন ওখানে? কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

এ কে আজাদ : পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস দেখলাম বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে সামরিক ও বেসামরিক সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে চাপ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। সম্মেলনেও তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় তিনি সেন্সরশিপ বনাম সেলফ সেন্সরশিপ নিয়ে চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। আসলে সম্মেলনের সব আলোচনাই সংবাদমাধ্যমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাকিস্তানের ডন, কানাডার টরন্টো স্টার, ভারতের আনন্দবাজার, বিবিসি বাংলাসহ আরো অনেক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই সাংবাদিকদের বক্তব্যেও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মুক্ত সাংবাদিকতার প্রসঙ্গটি।

প্রশ্ন : অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য স্বাধীন কমিশন গঠনের একটা প্রস্তাব এসেছে। আপনি কী মনে করেন?

এ কে আজাদ : এই প্রস্তাবটা আমরাই দিয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন যেটা করা হয়েছে, সেই কমিশনের কাছেই আমরা বলেছিলাম—কমিশন দরকার, যেখানে সরকার ৫০ শতাংশ খরচ দেবে আর ৫০ শতাংশ বিভিন্ন মিডিয়া থেকে যাবে। এটা একটা অটোনোমাস বডি হবে, যেখানে সাংবাদিক, মালিক, সরকার—সবারই স্বার্থ রক্ষা হবে। মাননীয় তথ্যমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, এটা নিয়ে তিনি কাজ করবেন। তিনি জানিয়েছেন, ওই কমিশনের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ করা আছে। বাকি ৩০ শতাংশ কাজ তিনি করবেন।

প্রশ্ন : সাংবাদিকদের জন্য ‘কোড অব কন্ডাক্ট’-এর কথা এসেছে। এটা কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

এ কে আজাদ : আমি মনে করি, এত কিছু করতে গেলে সমস্যা হবে। আমরা যেটা চাচ্ছি তা হলো, একটি স্বাধীন কমিশন। এই কমিশন যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বর্তমানে আমাদের যে প্রেস কাউন্সিল আছে, সেটি কার্যকর নয়। আমি মনে করি, এটি বিলুপ্ত করে দেওয়া উচিত।

প্রশ্ন : সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এই মুহূর্তে আর কী কী করা দরকার?

এ কে আজাদ : নোয়াব যেমন সক্রিয়, এডিটরস কাউন্সিল সক্রিয়, কিন্তু ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন অতটা না। কারণ তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভক্তি আছে। আমি মনে করি, তারা যদি সাংবাদিকতা করতে চায় এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাদের এই দলীয় রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে এবং গণমাধ্যমের স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে হবে। এতে সংবাদমাধ্যমের বর্তমান পরিবেশের অনেক উন্নতি হবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরো নিশ্চিত হবে।

প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে আপনার কী মনে হয়েছে?

এ কে আজাদ : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে আমাদের এটা মনে হয়েছে যে অতীতের সরকার যে ভুলগুলো করেছে, তাঁর সরকার সেই ভুলগুলো করবে না।

প্রশ্ন : গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী করতে হবে?

এ কে আজাদ : আমি মনে করি, সংবাদ প্রকাশে মালিকপক্ষের কোনো রকম হস্তক্ষেপ না করে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। জনস্বার্থবিষয়ক এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অনেক সময় লক্ষ করেছি, একটি প্রতিবেদন হয়ে তার আর কোনো ফলোআপ হয় না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ফলোআপ প্রতিবেদন খুব গুরুত্বপূর্ণ।

 সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here