দেশের সম্ভাবনাময় সিমেন্ট শিল্প দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদন খরচ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। অন্যদিকে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থবিরতা ও আবাসন খাতে মন্দার কারণে সিমেন্টের বাজার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) এবং খাত-সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, বিপুল বিনিয়োগের এই শিল্প খাতটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে।
সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানান, শিল্পের প্রধান প্রধান কাঁচামাল অর্থাৎ ক্লিঙ্কার, স্ল্যাগ, লাইমস্টোন, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসামের প্রায় শতভাগই আমদানি নির্ভর। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, লোহিত সাগর ও প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক নৌপথে সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে দূরবর্তী দেশগুলো থেকে বিকল্প রুটে কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) আকাশচুম্বী হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
উৎপাদন খরচের বৃদ্ধির মধ্যেই বড় ধাক্কা এসেছে আর্থিক খাত থেকে। দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দফায় দফায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) বৃদ্ধি করায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সিমেন্ট খাতের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যাংক ঋণনির্ভর। ফলে সুদহার বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলোর ওপর ঋণের কিস্তির বোঝা ও মূলধনি খরচ (বরোয়িং কস্ট) অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে, যা উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপাদন খরচের এ লাগামহীন বৃদ্ধির বিপরীতে সিমেন্টের দেশীয় বাজার এখন চরম মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত দেশের সিমেন্ট বিক্রির একটি বড় অংশ আসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প থেকে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি ধীরগতি হয়ে পড়েছে এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণের হার কমে গেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ব্যক্তিপর্যায়ে বাড়ি নির্মাণ এবং বেসরকারি আবাসন খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই সিমেন্টের অভ্যন্তরীণ বিক্রি প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। বাজারের এ সংকোচনের ফলে দেশের সিমেন্ট কারখানাগুলোতে এক বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি) অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। দেশে বর্তমানে সচল প্রায় ৪০টি সিমেন্ট কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টন। অথচ দেশে সিমেন্টের বার্ষিক চাহিদা মাত্র ৩ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৪ কোটি টনের কাছাকাছি। অর্থাৎ, সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি বা প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণ বেকার পড়ে রয়েছে। বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে কারখানা আংশিক সচল রাখায় প্রতি টন সিমেন্টের ফিক্সড কস্ট বা স্থায়ী পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কোম্পানিগুলো বাজারে সিমেন্টের দাম বাড়াতে পারছে না। লোকসান এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার কেউ কেউ বাজার ধরে রাখতে নামমাত্র মুনাফায় বা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে সিমেন্ট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর মুনাফার মার্জিন (প্রফিট মার্জিন) আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এ খাতকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজের গতি কমে এসেছে। একই সঙ্গে আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। উচ্চ সুদের হার এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিমেন্টের বাজারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে সিমেন্ট শিল্পে অস্থিরতা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ অন্যান্য খাতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে বেড়েছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। বিপরীতে সরকারি মেগা প্রকল্পের কাজ স্থবির হওয়ায় এবং নতুন মেগা প্রকল্প শুরু না হওয়ায় সিমেন্টের চাহিদা দিনদিন কমছে। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছেন।’
ডায়মন্ড সিমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার (বিপণন) আবদুর রহিম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার, স্ল্যাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসামের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিপরীতে দেশে সিমেন্টের চাহিদা কমেছে ক্রমান্বয়ে। চাহিদা কমলেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম সমন্বয় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

