দিল্লিতে তীব্র দাবদাহ, বিপাকে শ্রমজীবী মানুষেরা

0
দিল্লিতে তীব্র দাবদাহ, বিপাকে শ্রমজীবী মানুষেরা

তীব্র দাবদাহে পুড়ছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। দুপুরের চড়া রোদে যখন শহরের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন দিল্লির ব্যস্ত বাজারগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র। একদিকে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঝলমলে শোরুম, যেখানে ক্রেতারা স্বস্তিতে কেনাকাটা করছেন। আর ঠিক তার বাইরেই প্রখর সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরাচ্ছেন লাখো খেটে খাওয়া মানুষ। পথচারী, হকার, ফল বিক্রেতা কিংবা রিকশাচালকদের জন্য এই তীব্র গরমের মাঝেও কাজ থামিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই।

ভারতের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। কোনো ধরনের চুক্তিপত্র বা চাকরির নিরাপত্তা ছাড়াই দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে চলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন। তীব্র গরমে যখন শরীর আর চলতে চায় না, তখনও স্রেফ পেটের তাগিদে তাদের রাস্তায় নামতে হয়। দিল্লির সংকীর্ণ গলিপথে রিকশা চালানো ৫২ বছর বয়সী হরিশ চন্দ্রের মতো হাজারো মানুষের একটাই কথা, কাজ থামিয়ে দিলে ঘরে খাবার জুটবে না। তাই শরীর ভেঙে আসার উপক্রম হলেও তারা বিশ্রাম নিতে পারেন না।

পরিবারের ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে অনেকেই চরম সংকটে পড়ছেন। প্রচণ্ড গরমে নিজের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে রিকশাচালক হরিশ জানান, গরম সহ্য করতে না পেরে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের বিহারের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেখানেও তাপমাত্রা অনেক বেশি, তবে দিল্লির মতো ঘিঞ্জি পরিবেশ না থাকায় অন্তত বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। হরিশের মতো লাখো মানুষের কাছে দিল্লির এই গ্রীষ্মকাল এখন আর কোনো ঋতু নয় বরং টিকে থাকার এক বার্ষিক সংগ্রাম।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তাপপ্রবাহ এখন আরও দীর্ঘ, তীব্র এবং অনিয়মিত হয়ে উঠছে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ভারতে গরমের মৌসুম স্থায়ী হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ড. সৌম্য স্বামীনাথন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ভারতে বর্তমানে যে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে তা মানুষের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটি সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা উভয়ের জন্যই এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কংক্রিটের আধিক্য, অতিরিক্ত যানবাহন এবং অপর্যাপ্ত গাছপালার কারণে দিল্লি শহর এখন একটি তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। এই তীব্র সংকটের মুখে আবহাওয়া দপ্তর নিয়মিত সতর্কবার্তা জারি করছে। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাইকে হাইড্রেটেড থাকার এবং সাবধানে চলাফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারিভাবে হিট অ্যাকশন প্ল্যান বা বিশেষ সাড়াদান পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই নির্দেশনাগুলো মেনে চলা প্রায় অসম্ভব।

অটোচালক মোহাম্মদ উমর জানান, তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে গত সপ্তাহে তাকে একদিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কিন্তু একদিন কাজে না যাওয়ার অর্থ হলো প্রায় পাঁচশো থেকে সাতশো রুপি ক্ষতি হওয়া, যা তাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, তাপজনিত এই চরম মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের মোট কর্মঘণ্টা ৫.৮ শতাংশ কমে যেতে পারে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হবেন নির্মাণ ও কৃষি খাতের শ্রমিকেরা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই তীব্র গরমের মধ্যে থাকলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, কিডনির ওপর বাড়তি চাপ এবং হিট স্ট্রোকের মতো ঘটনা এখন দিল্লির হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন রাতেও তাপমাত্রা খুব একটা কমে না। ঘিঞ্জি বস্তি এলাকার টিনের ঘরে বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা না থাকায় রাতেও শরীর ঠান্ডা হতে পারে না, যার ফলে দিনের পর দিন ক্লান্তি জমতে থাকে।

সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন নারীরা, যাদের বাইরের কাজের পাশাপাশি ঘরে ফিরেও তীব্র গরমের মধ্যে রান্না ও সন্তান লালন-পালনের মতো কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। কারখানায় ও মানুষের বাসায় কাজ করা ৪০ বছর বয়সী বিধবা সানজিদা জানান, সকাল থেকেই সূর্য যেন আগুন ছড়াতে শুরু করে। মানুষের ঘরে যখন তিনি ঘর মোছার কাজ শুরু করেন, তখন গরমে তার শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যায়। রোদের তাপে ছাদের পাথরগুলো যেন ফুটন্ত আগুনের মতো মনে হয়। তবুও বেঁচে থাকার তাগিদে, তাপমাত্রা যত শতাংশই হোক না কেন, কাজ তাদের করতেই হয়।

সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here