গেল বছর সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী এআই মডেল চালু করে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলেছিল চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক। এবার তাদের বহুল প্রতীক্ষিত পরবর্তী প্রজন্মের এআই মডেল চালুর ক্ষেত্রে বাজারের প্রতিক্রিয়া বেশ স্তিমিত।
দ্রুতপরিবর্তনশীল এ প্রযুক্তির বাজারে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি বাস্তববাদী বলেই মনে হচ্ছে। এর আগে, হাংঝুভিত্তিক এ কোম্পানিটি ‘ডিপসিক ভি৩’ ও ‘আর১’ নামের মডেল বাজারে এনেছিল। কোম্পানিটির দাবি, মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করার মতো করে এগুলো তৈরি হয়েছে। ওই সময় এ খবর বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ারের দামে ধস নামিয়েছিল। কারণ, বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এআই পরিকাঠামো তৈরিতে তবে কেন এত বিপুল অর্থ খরচ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই ঘটনা ছিল এক ধরনের ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ বা অপ্রত্যাশিত তবে প্রভাব ফেলার মতো ঘটনা, যা খরচ, প্রতিযোগিতা ও মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের উদ্ভাবনী সক্ষমতা সম্পর্কে আগের সব ধারণা বদলে দিতে বাধ্য করেছিল।
গত শুক্রবার বাজারে আসা ‘ডিপসিক-ভি৪’ এর প্রতি বাজারের এই স্তিমিত প্রতিক্রিয়ায় প্রমাণ মিলেছে, মানুষের ধারণা কত দ্রুত বদলেছে। বর্তমানে বাজার ও এ শিল্পখাত সীমিত প্রযুক্তির মধ্যে তৈরি করা স্বল্পমূল্যের এবং কার্যকর এআই মডেলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে অবাক হওয়ার সুযোগ কমেছে। ‘ওমডিয়া’র প্রধান বিশ্লেষক লিয়ান জে সু বলেছেন, ডিপসিকের এ ঘোষণাটি অনুমেয় পথই অনুসরণ করেছে। মডেলের গঠনশৈলী ও কার্যসক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি এখন শিল্পখাত ও একাডেমিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে চর্চা হচ্ছে।
বিভিন্ন বেঞ্চমার্ক ডেটাও এ মতকে সমর্থন করছে। ‘আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস’ এর তথ্য বলছে, ‘ডিপসিক-ভি৪ প্রো’ আগের বিভিন্ন সংস্করণের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখালেও তা বর্তমানের সেরা ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেলগুলোর কাতারেই অবস্থান করছে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের পুরোপুরি ছাড়িয়ে যেতে পারেনি, বিশেষ করে ‘কিমি’ ও ‘কোয়েন’ এর মতো প্রতিযোগী বিভিন্ন মডেল দ্রুত উন্নতি করে ব্যবধান কমিয়ে এনেছে।
গত বছরের চিত্রটি ছিল এর ঠিক উল্টো। ওই সময় ডিপসিক তার দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল, যা চীনে এর দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বজুড়েও বড় প্রভাব ফেলেছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের সেই আলোড়নের পেছনে বেশ কিছু কারণও ছিল। এর মধ্যে ছিল মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর আকাশচুম্বী বাজারমূল্য, গুটিকয়েক বড় কোম্পানির একাধিপত্য ধরে রাখার প্রত্যাশা এবং প্রায় অপরিচিত এক চীনা স্টার্টআপের বিস্ময়কর ভালো ফলাফল।
তবে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। বিশ্লেষক সু বলেছেন, নতুন কোনো প্রতিযোগী উঠে আসবে এমন প্রত্যাশা এখন বিনিয়োগকারীদের হিসাবের মধ্যেই থাকে।” এআইয়ের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা উভয় বিষয়েই বাজার এখন বেশি বাস্তববাদী। একইসঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। অনেকগুলো কোম্পানি বর্তমানে শক্তিশালী সব মডেল বাজারে আনছে। ফলে ডিপসিকের একক আধিপত্য বা এগিয়ে থাকার ব্যবধানটুকু কমে আসছে।
সোমবার দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শেয়ার বাজার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার মূলে ছিল এআইসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আশাবাদ। ‘অ্যানকুরা চায়না অ্যাডভাইজার’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলফ্রেডো মন্টুফার-হেলু বলেছেন, ‘ভি৪’ এর গুরুত্ব বাজারের প্রভাবের চেয়ে বরং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বেশি।
ডিপসিক তাদের ‘ভি৪’ মডেলটিকে হুয়াওয়ে চিপে সবচেয়ে ভালোভাবে চলার উপযোগী করে তৈরি করেছে। যার কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করছে, যেন চীনা বাজার এআই মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক মার্কিন চিপগুলো না পায়। তিনি বলেছেন, সেই চমকপ্রদ বিষয়টি গত বছরই শেষ হয়ে গেছে, বাজার তা আগেভাগেই গ্রহণ করে নিয়েছে। এখন আসল দেখার বিষয়, চীন কি এআই উন্নয়নে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে এবং তা তাদের নিজস্ব চিপ দিয়েই সম্ভব করবে কি না। যদি তা হয় তবে এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

