ট্রাম্পকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলছেন ইসরায়েলিরা: দ্য গার্ডিয়ান

0
ট্রাম্পকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলছেন ইসরায়েলিরা: দ্য গার্ডিয়ান

দীর্ঘ প্রায় চার মাসের যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে নিজেদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে মনে করছেন অনেকে ইসরায়েলি। এমনকি অনেক নাগরিক ও বিশ্লেষকের মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলকে দুর্বল অবস্থায় ফেলেছে এবং মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও নষ্ট করেছে।

রেহোভোতের হার্ৎজল স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয় সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রায় সবাই একমত ছিলেন যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য ভালো হয়নি। ৫৫ বছর বয়সী আভি পেরেজ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং তাকে একাই সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। ৩৫ বছর বয়সী শাহাম নোভিক বলেন, এটা অদ্ভুত। একদিন আমরা সন্তানদের নিয়ে বোমা আশ্রয়ে ছিলাম, পরদিন সব স্বাভাবিক বলা হচ্ছে। কিন্তু কিছুই সমাধান হয়নি।

রেহোভোত শহরটি, যা তেল-আবিব থেকে প্রায় ১২ মাইল দূরে, সাধারণত ‘মধ্য ইসরায়েল’ হিসেবে পরিচিত এবং দেশটির জনমতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। শহরের রাস্তায় ইসরায়েলি ও জাতীয় পতাকা, একদিকে আধুনিক সংগীত, অন্যদিকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি বিভক্ত সমাজের চিত্র দেখা যায়।

অনেকে রেস্তোরাঁয় এসেছিলেন খবর থেকে কিছুটা দূরে থাকতে। কারণ, একই সময়ে লেবাননে আবারও যুদ্ধবিগ্রহের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় সেখানে ১৮ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর হামলায় চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।

অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি একটি ‘বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্লেষকেরা একে আত্মসমর্পণ ও অপমান হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ইসরায়েলের প্রত্যাশার চেয়েও খারাপ।

অনেকের উদ্বেগ শুধু ইরান নয়, বরং লেবানন চুক্তি ইসরায়েলের উত্তরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে দুর্বল করবে বলেও তারা মনে করছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক উদি টেনে বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই মনে করেন ইরান ও হিজবুল্লাহ কার্যত একই হুমকির অংশ। উত্তর সীমান্তের মেতুল্লা শহরে স্থানীয়রা আরও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক রেস্তোরাঁ মালিক ড্যানিয়েল ডর্ফম্যান বলেন, এটা বড় ভুল। ইরান যুদ্ধ নিয়ে সবাই খুশি ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি ইসরায়েলের জন্য ভালো হয়নি।

কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, ইসরায়েল তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য—ইরানে শাসন পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল—এগুলো অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুদ্ধ শুরু করেও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়েছে এবং তাদের ছোট শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ-এর কলামিস্ট নাদাভ ইয়াল লিখেছেন, ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই গভীর ধাক্কা ও হতাশায় আছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন কঠিন রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে জনসমর্থন কমে গেছে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক প্রফেসর তামার হারম্যান বলেন, নেতানিয়াহু নিজের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো পূরণ না হলে জনগণের কাছে ব্যর্থতার ধারণা তৈরি হয়। দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ এখন অত্যন্ত বিভক্ত। আগামী নির্বাচনে পরিস্থিতি বড় মোড় নিতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

সমালোচনা ও হতাশার মধ্যেও কিছু মানুষ এখনও নেতানিয়াহুকে সমর্থন করছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য নেতানিয়াহুই সবচেয়ে উপযুক্ত নেতা। রেহোভোতের একজন প্রকৌশলী আভি পেরেজ বলেন, নেতানিয়াহু ভুল করলেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম এবং দেশের স্বার্থ বোঝেন। 

তবে অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকটকে ব্যবহার করে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে এবং জনগণের মূল সমস্যাগুলো- জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ- উপেক্ষিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলি সমাজ এখন আগের চেয়ে বেশি বিভক্ত, তবে সবাই কিছু মৌলিক বিষয়ে একমত- নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের পরিচয় এবং কঠোর অবস্থান।

রেহোভোতের বাসিন্দা ডালিয়া পেরেজ বলেন, এই ঘটনাগুলো তাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে শান্তি কখনওই আসবে না। তার ভাষায়, আমাদের হয়তো সবসময়ই যুদ্ধের মধ্যেই থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা এখন বুঝে গেছি, আমাদের কোনও বন্ধু নেই এবং কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here