জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

0
জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা কোটি মানুষের স্বার্থে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোকে কাজে এবং অঙ্গীকারগুলোকে ফলাফলে রূপান্তর করার, যাতে বিশ্ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করতে পারে। আমরা আশা করি কপ৩১ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হবে এবং বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালন করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

ডালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সভায় ‘একটি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জলবায়ু নেতৃত্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের ৩১তম অধিবেশন বা কপ৩১-এ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন এবং প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ও চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা উচিত।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংলাপের প্রসার, ঐক্যমত্য তৈরি এবং যৌথ পদক্ষেপকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম একটি মূল্যবান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, জলবায়ুর জন্য নেওয়া পদক্ষেপ কোনো বাড়তি খরচ বা অপব্যয় নয়। আমরা এটিকে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং অংশীদারত্বের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখি। এখানে উপস্থিত আমরা সবাই মিলে এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি যা আরও সবুজ, নিরাপদ, আরও টেকসই এবং আরও ন্যায়সঙ্গত।

জলবায়ু সহনশীলতা কোনো একক দেশের পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর জন্য অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমরা যখন কপ৩১ এবং কপ৩২-এর দিকে তাকিয়ে আছি, তখন আমরা তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর জোর দিতে চাই। প্রথমত, ‘ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল’ অবশ্যই প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে রূপ নিতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগী দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য এবং নিশ্চিত সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে আরও সহজলভ্য, সহজ শর্তে এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর চাহিদার প্রতি সাড়াদানকারী হতে হবে। এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকেও ত্বরান্বিত করবে। এই ক্ষেত্রে, আমাদের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড আরও বেশি সচল ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের সাথে মানিয়ে নেওয়া বা অভিযোজনকে প্রশমনের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনসিটিএডি) বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন যৌথ পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারিত ৩০০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশমন ও অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে অপর্যাপ্ত।

তিনি বলেন, আমরা আজ এখানে কেবল জলবায়ু সংকটের প্রথম সারির ভুক্তভোগী দেশ হিসেবেই আসিনি, বরং বৈশ্বিক সমাধান দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটি জাতি হিসেবে উপস্থিত হয়েছি। আমরা আমাদের লড়াই বা সংকট দিয়ে পরিচিত হতে চাই না, বরং আমরা আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বা সহনশীলতা দিয়ে পরিচিত হতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে যেমনটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার একটি শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু-সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশ রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগতভাবে এটি এমন একটি বিষয় যা আমি গভীরভাবে ধারণ করি এবং এর জন্য কাজ করে যাই। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার লড়াই।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা আগামী ৫ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করার লক্ষ্য নিয়েছি। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কৃষিতে সহায়তা দিতে এবং জলবায়ুর ধাক্কা মোকাবিলা করতে আমরা আমাদের প্রধান নদীতে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছি। এছাড়া, আমরা একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকীকরণ করছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা আগামী ৫ বছরে ২৫০ মিলিয়ন (২৫ কোটি) গাছ রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। স্কুল, সামাজিক সংগঠন এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করে দেশব্যাপী আন্দোলনের মাধ্যমে— যেমন ‘এক শিক্ষার্থী, একটি গাছ’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ বনের পরিধি বাড়াবে, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করবে, পরিবেশ-বান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং তাপমাত্রা কমিয়ে আনবে।

তারেক রহমান বলেন, তার সরকার বন, জলাভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করছে। আমরা গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জলাধারে বিনিয়োগ করছি এবং পরিবেশ-বান্ধব আবাসন বা গ্রিন বিল্ডিং মানদণ্ড চালু করছি। একইসঙ্গে সরকার সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য সমাধানের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। 

তিনি বলেন, আমরা পাটজাত পণ্য এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো পরিবেশ-বান্ধব পরিবহনের মতো সবুজ শিল্পগুলোকে উৎসাহিত করছি। পরিবেশ-বান্ধব বিনিয়োগ এবং কার্বন-ক্রেডিট সুবিধা উন্মোচনের জন্য একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা হবে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে। আমরা ইতোমধ্যে পরিবেশ-বান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছি। এখন আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি যে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড-সার্টিফাইড কারখানার মধ্যে ৬৯টিই বাংলাদেশের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here