জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিতে কার্যকর বিকল্প ভার্মি কম্পোস্ট

0
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিতে কার্যকর বিকল্প ভার্মি কম্পোস্ট

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি খাত যখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট’ বা জলবায়ু সহনশীল কৃষি সমাধানের গ্রহণযোগ্যতা। উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানোর সক্ষমতার কারণে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার এখন কৃষিতে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।

কৃষিবিদদের মতে, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি করে, পানি ধারণক্ষমতা উন্নত করে এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমায়। একই সঙ্গে এটি মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিশ্চিত হয়ে ওঠা কৃষি ব্যবস্থায় এটি একটি টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন গৃহভিত্তিক উৎপাদনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক পর্যায়েও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার বাড়ছে। কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো কৃষকদের জন্য পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগের পাশাপাশি জৈবসার ব্যবহারের বিষয়টিকেও তাদের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুক্ত করেছে।

এমনই একজন কৃষক পাবনার ঈশ্বরদীর শাকিল প্রামাণিক। তিনি মূলত আখ উৎপাদন করে থাকেন। শাকিল প্রথমে একটি টোল-ফ্রি নম্বরে যোগাযোগ করে জানতে চান, কী ধরনের সার তার জমির জন্য উপযোগী হতে পারে। পরামর্শ অনুযায়ী তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করেন। ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ায় পরে তিনি একসঙ্গে ১ দশমিক ৫ টন ভার্মি কম্পোস্ট অর্ডার দেন।

কয়েক সপ্তাহ পর আবারও তিনি অতিরিক্ত ১ টন সার অর্ডার করেন। শুধু তাই নয়, তার আখ ক্ষেতে ভালো ফলন দেখে পাশের জমির আরেক কৃষকও নিজের জন্য ১ টন ভার্মি কম্পোস্ট সংগ্রহ করেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফিল্ড টিম দ্রুত সার সরবরাহ করায় কৃষিকাজেও কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। কৃষকের আস্থা তৈরি হলে নতুন কৃষি উদ্ভাবন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে শিল্পজাত ফসলের বড় কৃষকরাও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক প্রশিক্ষণ সেশনগুলোতে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন। কৃষি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইফার্মার তাদের ‘কৃষি পাঠশালা’ প্ল্যাটফর্মে ভার্মি কম্পোস্ট বিষয়ক স্বল্পমূল্যের মাস্টারক্লাস চালু করেছে, যেখানে কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভার্মি কম্পোস্টভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের জন্যও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। গবাদিপশুর বর্জ্য ও জৈব আবর্জনা ব্যবহার করে কম খরচে সার উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক পরিবার অতিরিক্ত আয় করছে।

তবে এই সারের মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করার ক্ষেত্রে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। সেই সাথে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে ভার্মি কম্পোস্ট বাংলাদেশের টেকসই কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ভার্মি কম্পোস্ট হতে পারে কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সম্ভাবনাময় এক সমাধান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here