গত অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানোর নামে উল্টো বাড়ানো হয়েছে করের বোঝা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে আয় না বাড়লেও করযোগ্য যেকোনো ধরনের আয় থাকলেই গেল করবর্ষের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে সামনের অর্থবছরে। ৬০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা একজন কর্মীর পকেট থেকে বাড়তি কাটা যাবে আড়াই হাজার টাকা। ক্ষেত্রবিশেষে করের পরিমাণ বাড়বে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত।
এতে সংসার খরচ চালাতে আরো চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। অর্থাৎ ড. ইউনূস সরকার পরবর্তী দুই বছরের জন্য যে আগাম করের বোঝা চাপিয়ে গেছে, তা নতুন করে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ালে ওই হারেই কর দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ছিল তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেই অঙ্কে কোনো হাত দেয়নি তৎকালীন সরকার। তবে পরের দুই বছরের জন্য দিয়ে গেছে রূপরেখা। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
কিন্তু এর পরের তিন লাখ টাকার ওপর কর দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। এর পরের চার লাখ আয়ের ওপর গুনতে হবে আরো ১৫ শতাংশ কর। আগে করমুক্ত সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা হলেও পরের এক লাখ টাকার ওপর কর দিতে হতো পাঁচ শতাংশ হারে। তার পরের চার লাখের ওপর করহার ছিল ১০ শতাংশ। ধীরে ধীরে ওপরের স্লাবে এই হার আরো বাড়ানো হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত করবর্ষে ৬০ হাজার টাকা বেতনের একজন কর্মীকে কর দিতে হয়েছে (কোনো রেয়াত না থাকলে) ১২ হাজার টাকা। নতুন পদ্ধতিতে বেতন সমান থাকলেও কর দিতে হবে ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। ৭০ হাজার টাকা বেতনের কর্মীকে কর দিতে হবে ১৮ হাজার ১৬৭ টাকা। কিন্তু বর্তমান নিয়মে দিতে হবে ২৩ হাজার ১৬৭ টাকা।
বর্তমান বাজারমূল্যে লাখ টাকার নিচে আয় থাকলে তার পক্ষে কোনো সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করা কঠিন। কোনো রেয়াত না থাকলে এক লাখ টাকা বেতনের বিপরীতে গেল করবর্ষে কর দিতে হয়েছিল ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু বেতন না বাড়লেও আগামী করবর্ষে কর দিতে হবে ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা। মাসে লাখ টাকা আয় করলে করযোগ্য আয় দাঁড়ায় আট লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ টাকা।
কোনো বিনিয়োগ থাকলে তা করযোগ্য আয়ের সর্বোচ্চ তিন শতাংশ পর্যন্ত করছাড় পাওয়া যায়। তাহলে সেই করছাড়ের অঙ্ক দাঁড়ায় ২৬ হাজার টাকা। গেল করবর্ষে বিনিয়োগের ওপর সর্বোচ্চ ছাড় থাকলে কর দিতে হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। আগামী করবর্ষে বিনিয়োগের ওপর সর্বোচ্চ রেয়াত পেলেও একই ব্যক্তিকে কর দিতে হবে ৩২ হাজার ৭৫০ টাকা। করমুক্ত আয়সীমা বাড়লে করের বোঝা কমার কথা। কিন্তু করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ফাঁদ তৈরি করে করদাতার বোঝা বাড়ানো হয়েছে ১১ হাজার ২৫০ টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে কর বাড়বে ৫২.৩২ শতাংশ।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও কর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। তবে জনস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অনেক মানুষ করের আওতার বাইরে চলে যাবে, এই যুক্তিতে এ বিষয়ে ভাবছে না কর বিভাগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আগামী দুই বছরের জন্য করহার নির্ধারণ করে গেছে। বর্তমান করকাঠামোতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কিছুটা কষ্ট হবে। কিন্তু সরকারের সামনে খরচ মেটাতে আয় বাড়ানোর চাপ আছে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ালে আরো অনেক মানুষ করজালের বাইরে চলে যাবে। তখন সরকার আরো চাপে পড়বে। কর আদায় বাড়িয়ে সরকার ভর্তুকি, সামাজিক কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখলে ঘুরেফিরে করদাতাই সুফল পাবেন।’
তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন বাংলাদেশেও দাউ দাউ করে জ্বলছে। সরকার প্রথমদিকে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও পরে তেলের দাম বাড়িয়েছে। আগে থেকেই ছিল মূল্যস্ফীতির চাপ, যা এবার আরো বেড়েছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতির গতি অনেকটাই স্লথ। মানুষের সুরক্ষা, ন্যায্যতার মানদণ্ড ও সৎ করদাতাদের উৎসাহিত করতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত।
বেসরকারি গবেষণাসংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আছে, সামনের দিনেও হয়তো থাকবে। যুদ্ধের কারণে দাম বাড়ছে, অর্থনীতির গতিও কিছুটা স্লথ হচ্ছে। এসব কিছু বাজেটে চিন্তা করা উচিত। এর ফলে অর্থনীতিতে মানুষের সুরক্ষা হবে ও ন্যায্যতার ভিত্তি তৈরি হবে। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কর আদায়। এতে আইএমএফেরও চাপ আছে। এ জন্যই হয়তো সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কর আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে কর ফাঁকি রোধে। সৎ করদাতাদের শাস্তি দেওয়া ঠিক না।’
ঢাকা ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন খান বলেন, ‘বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো সময়ের চাহিদা। এই সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা উচিত। দেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ালে প্রান্তিক পর্যায়ের করদাতারা ভোগান্তিতে পড়বেন। সৎ করদাতারা সরকারের কোষাগারে টাকা জমা দিতে নিরুৎসাহিত হবেন।’

