ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটর জেনারেল রুসলান ক্রাভচেঙ্কো জানিয়েছেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জন্য চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আকাশপথকে নিয়মিত ব্যবহার করছে। এই ধরনের সামরিক তৎপরতা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে তিনি সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। আগামী রবিবার চেরনোবিল বিপর্যয়ের ৪০তম বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি চলাকালীন এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি সামনে এলো।
রুশ বাহিনীর ছোঁড়া হাইপারসনিক কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাঝেমধ্যেই চেরনোবিল এবং পশ্চিম ইউক্রেনের খমেলনিটস্কি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউটর জেনারেলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫টি কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্র এই কেন্দ্রগুলোর ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের বিপজ্জনক উড্ডয়ন কোনো সামরিক কৌশল নয় বরং সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যেই করা হচ্ছে বলে কিয়েভ দাবি করছে।
ক্রাভচেঙ্কো আরও জানিয়েছেন, অন্তত তিনটি কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্র খমেলনিটস্কি পারমাণবিক কেন্দ্রের মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে বিধ্বস্ত হয়েছে। উদ্ধারকৃত ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে এগুলো ইউক্রেনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়নি বরং উড্ডয়নকালীন কারিগরি ত্রুটির কারণে সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়েছে। পারমাণবিক কেন্দ্রের এত কাছে এই শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পতন যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারতো।
বিগত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের শুরুতেই চেরনোবিল কেন্দ্রটি এক মাসেরও বেশি সময় রাশিয়ার দখলে ছিল। রুশ সেনারা পরে সেখান থেকে পিছু হটলেও ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে চেরেনোবিল তেজস্ক্রিয়তা নিরোধক ঢালের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৯২টি রুশ ড্রোনের উপস্থিতি রাডারে ধরা পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই ড্রোনের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে কারণ রাডারে অনেক সময় একাধিক ড্রোনকে একটি বিন্দু হিসেবে দেখায়।
চেরনোবিলের চতুর্থ রিয়্যাক্টরটি ১৯৮৬ সালে বিস্ফোরিত হওয়ার পর সেটি ঢেকে রাখার জন্য যে বিশেষ নিরাপত্তা কাঠামো বা রেডিয়েশন শিল্ড তৈরি করা হয়েছিল সেটিও এখন হুমকির মুখে রয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার একটি দূরপাল্লার ড্রোন এই সুরক্ষা কাঠামোতে সরাসরি আঘাত হেনেছিল যার ফলে কাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিয়েভের তদন্তকারী দল ড্রোনটির আছড়ে পড়ার ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে যে এই হামলাটি ছিল পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত।
ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের এক প্রাক্কলন অনুযায়ী ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত এই সুরক্ষা কাঠামো মেরামত করতে প্রায় ৫০ কোটি ইউরোর (৫৮ কোটি ডলার) বেশি খরচ হতে পারে। যদি আগামী চার বছরের মধ্যে এই সংস্কার কাজ সম্পন্ন না করা হয় তবে কাঠামোটিতে অপরিবর্তনীয় ক্ষয় বা জং ধরতে শুরু করবে। এর ফলে পুনরায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে যা কেবল ইউক্রেন নয় বরং পুরো ইউরোপের পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর হবে।
রাশিয়া অবশ্য বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দাবি করছে যে তারা কেবল ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ক্রেমলিন চর্নোবিল কেন্দ্রে হামলার ঘটনাটিকে ইউক্রেনের সাজানো উসকানি হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ইউক্রেনের দাবি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে রাশিয়া জনমানবশূন্য চেরনোবিল বনাঞ্চলকে ড্রোন চলাচলের রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে যা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন একটি কাজ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কাছে এই সামরিক তৎপরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বারবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন যাতে ১৯৮৬ সালের মতো আরেকটি ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চেরনোবিলের আকাশে যুদ্ধাস্ত্রের এই ঘনঘটা বিশ্ববাসীর মনে নতুন করে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ভীতি জাগিয়ে তুলেছে।
সূত্র: রয়টার্স

