চীন দেখালো আমেরিকার দিন ফুরাচ্ছে

0
চীন দেখালো আমেরিকার দিন ফুরাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী চাপ কিংবা নানামুখী হুমকির মুখে চীন আর পিছু হটছে না বরং ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের চাল এখন ধরে ফেলেছে বেইজিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর আপাতদৃষ্টিতে তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হতে পারেনি। সাধারণত যেকোনো শীর্ষ সফরের আগে দুই দেশের কূটনৈতিক মহল দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয়, যাতে বিশ্বমঞ্চে একটি সফল সমাপ্তি প্রদর্শন করা যায়। কিন্তু ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এবারের বৈঠকে তেমন কোনো বড় বা সুনির্দিষ্ট যৌথ ঘোষণা আসেনি, যা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ।

সফরের আগে ট্রাম্প স্বীয় স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছিলেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে একযোগে কাজ করার বার্তা দিয়েছিলেন। এমনকি আমেরিকার শীর্ষ কর্পোরেট প্রধানদের একটি শক্তিশালী দলকেও তিনি বেইজিংয়ে সঙ্গে নিয়ে যান, যাতে বড় ধরনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করা সম্ভব হয়। কিন্তু চীনের নেতৃত্ব ট্রাম্পের এই ক্ষণস্থায়ী ও লেনদেনভিত্তিক কূটনৈতিক কৌশলকে আগে থেকেই মেপে রেখেছিল। ট্রাম্পের অতীত আচরণ ও চরম চাপ সৃষ্টির নীতি বেইজিংয়ের কাছে তাকে একজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর শুল্কযুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে এসেও স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর জরুরি শুল্ক আরোপ করেন। প্রযুক্তি খাতে বেইজিংয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চীনের আধিপত্য রুখতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওয়াশিংটন। বিপরীতে চীনও বসে থাকেনি। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর ওপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলকে কাঁপিয়ে দিয়ে বিরল খনিজ উপাদান ও চুম্বকীয় পণ্যের রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করে।

ট্রাম্পের বেইজিং সফরের ঠিক আগমুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের ব্যর্থতা ওয়াশিংটনের হাতকে বেশ দুর্বল করে দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে আমেরিকার অক্ষমতা এবং ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করতে না পারার বিষয়টি বেইজিংয়ের দরকষাকষিতে চীনকে সুবিধাজনক অবস্থানে বসিয়ে দেয়। ফলে ট্রাম্প যখন বেইজিংয়ে মার্কিন কর্পোরেট প্রধানদের পেছনে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়েছিলেন, তখন তা বেইজিংয়ের চোখে আমেরিকার পরোক্ষ আত্মসমর্পণের মতোই দেখিয়েছে। এতকাল ধরে চলা মার্কিন ডিকাপলিং বা অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের পর ট্রাম্প মূলত চীনের বাজারের কাছেই পুনরায় ধরনা দিয়েছেন।

আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শি জিনপিং বেশ কড়া ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে ট্রাম্পের মুখোমুখি হন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমেরিকাকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হতে হবে। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসের ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা উদীয়মান শক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত শক্তির অনিবার্য সংঘাতের তত্ত্বটি উল্লেখ করে জিনপিং বার্তা দেন যে বেইজিং এখন অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক দিক থেকে এতটাই শক্তিশালী যে তারা আমেরিকাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারে। চীন ২০৪৯ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তারা এখন আমেরিকার সঙ্গে সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি দ্বিমেরু বিশ্ব বা জি-টু কাঠামোর স্বীকৃতি চায়।

দীর্ঘ আলোচনার পরও এই শীর্ষ সম্মেলন শেষে কোনো যৌথ ইশতেহার জারি করা সম্ভব হয়নি। এটা প্রমাণ করে যে দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য এখনো কতটা গভীর। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি ছিল অনেকটাই ম্লান ও সংক্ষিপ্ত, যেখানে ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ অতিশয়োক্তির কোনো বালাই ছিল না। মার্কিন বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, দুই নেতার মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে এবং বাণিজ্য তদারকির জন্য একটি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। ট্রাম্প চীনের পক্ষ থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার দাবি করলেও বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এর কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে সংবেদনশীল তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে তাইওয়ান ইস্যুটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে সরাসরি সংঘাত ও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শি জিনপিং এখানে আমেরিকার জন্য রেড লাইন টেনে দিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প এই কড়া হুঁশিয়ারির পর তাইওয়ানকে বিপুল সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে কিছুটা রক্ষণাত্মক ও এড়িয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করেছেন, যা আমেরিকার পূর্ববর্তী অবস্থানের চেয়ে বেশ নমনীয়।

ইরান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়েও ট্রাম্পের দাবিকে বেইজিং তাদের সরকারি বিবৃতিতে নাকচ করে দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র না পায় সে বিষয়ে চীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিন্তু বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ব্যবহার একটি কানাগলি এবং সেখানে আমেরিকার একতরফা নিষেধাজ্ঞার নীতিই সংকটের মূল কারণ। সামগ্রিকভাবে, চীনের মূলধারার গণমাধ্যমে ট্রাম্পের এই সফরকে খুব একটা বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনের কোনো ফাঁকা হুমকিতে বেইজিং আর বিভ্রান্ত হতে রাজি নয়।

এনডিটিভির নিবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here