চলতি জুন মাসেই তিনটি ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাজেট সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ১.৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি) ডলার অনুমোদন করতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে চাপে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসবে।
এই তহবিলের মধ্যে, র্যাপিড রেসপন্স অপশন (আরআরও) উইন্ডোর আওতায় চলমান প্রকল্প ঋণ থেকে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার পুনর্নির্ধারণ (রিপারপাস) করা হবে। সার আমদানি ও খাদ্য সহায়তার জন্য দেওয়া হবে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ থাকবে ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওয়াশিংটন ডিসি এবং ঢাকা উভয় স্থানেই কয়েক দফা আলোচনার পর এই বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাব বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বাড়তি জ্বালানি ও সার আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ২.৬১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এ কারণে এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে জরুরি বাজেট সহায়তা চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। যুদ্ধের ফলে এলএনজি, জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাংক সেই অনুরোধের অংশ হিসেবেই এই সহায়তা দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলো কোনো অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষেত্রে আরআরও সুবিধার আওতায় চলমান প্রকল্প পোর্টফোলিওর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পুনর্বিন্যাস করতে পারে। গত ৫ এপ্রিল এই সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ।
আরআরওর আওতায় সহায়তা পাওয়ার দুটি উপায় রয়েছে। এর একটি হলো কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট (সিইআরপি)। এর মাধ্যমে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি আমদানির মতো ব্যয়ের জন্য অর্থায়ন করা যায়।
বাংলাদেশ সিইআরপি ব্যবস্থার আওতায় ১২টি প্রকল্প থেকে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলার পুনর্বিন্যাস করে বাজেট সহায়তা হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এছাড়া, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রামের আওতায় আরও ৪০০ মিলিয়ন ডলার নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ তদারকি ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের খসড়াগুলো ব্যাংক মালিকদের বিরোধিতার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ডিভিশন খসড়াগুলো পুনর্বিবেচনা ও পরামর্শের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে।
অন্যান্য সংস্কারের মধ্যে রয়েছে আমানত সুরক্ষা আইন সংশোধন, সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দেউলিয়াত্বসংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়ন, এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে খেলাপি ঋণ আদায়ে ছোট প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান।
এ লক্ষ্যে দুটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে। সেগুলো ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট এবং ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি অ্যাক্ট।
ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের মতো আইনি ক্ষমতা দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের লাইসেন্স দেওয়া হবে। যেটি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই আইন খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, ব্যবস্থাপনা, সিকিউরিটাইজেশন এবং বেচাকেনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করবে। এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।
অন্যদিকে, ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি অ্যাক্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে নয়টি বেসরকারি ব্যাংকে একিউআর সম্পন্ন করেছে। যার পর পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচি সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদানের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের সংজ্ঞাগত ফাঁক-ফোকরের কারণে পারিবারিক সম্পর্কের জটিল কাঠামো ব্যবহার করে ঋণের প্রকৃত পরিমাণ আড়াল করা হয়েছে। যার ফলে জালিয়াতি, ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি এবং ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাত থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাব এবং নিয়ন্ত্রকদের নমনীয় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে উৎসাহ দিয়েছে, বাজার শৃঙ্খলা দুর্বল করেছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তারা দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের ২৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যার মূল্য ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং যা দেশের জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশের সমান। এর মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থা-গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
এই প্রেক্ষাপটে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো, আমানত সুরক্ষা জোরদার করা, তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও সমাধান প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা, যার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান করবে, বর্তমান ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়াবে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও সমাধানের পথ সুগম করবে। প্রয়োজনে সংস্কারকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পুনঃমূলধনীকরণও করা যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই কর্মসূচি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, আর্থিক মধ্যস্থতা শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

