ইউরোপের দেশগুলোকে গান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এক করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ইউরোভিশন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতা এখন রাজনৈতিক বিতর্ক, যুদ্ধ এবং মানবাধিকার ইস্যুর বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এবারের আসরেও তার বড় প্রমাণ মিলেছে।
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে পাঁচটি দেশ বয়কট করেছে, যা ইউরোভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গাজায় চলমান হামলার কারণে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আইসল্যান্ড অংশ নেয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ‘অবৈধ যুদ্ধ ও গণহত্যার সামনে নীরব থাকা সম্ভব নয়।’ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে স্পেন বিকল্প সংগীত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে। স্লোভেনিয়া দেখিয়েছে গাজা নিয়ে তথ্যচিত্র, আর আয়ারল্যান্ড প্রচার করেছে একটি ব্যঙ্গাত্মক পুরোনো টিভি পর্ব।
মূল মঞ্চে গান চললেও বাইরে ছিল উত্তপ্ত পরিবেশ। ইসরায়েলের শিল্পী নোয়াম বেত্তানের পরিবেশনার সময় দর্শকদের মধ্যে থেকে ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ স্লোগান ওঠে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয় পুরো ভেন্যুতে। অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থীরা এই বয়কটকে ইহুদিবিদ্বেষ বলে দাবি করেছে।

এই প্রথম নয়, ইউরোভিশনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৬৯ সালে স্পেনে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে অস্ট্রিয়া বয়কট করেছিল প্রতিযোগিতা। এরপরও বিভিন্ন সময় যুদ্ধ, কূটনীতি এবং রাজনীতির কারণে প্রতিযোগিতা প্রভাবিত হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুও প্রভাব ফেলেছে এই মঞ্চে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের পর থেকে ইউরোভিশনে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়নের (ইবিইউ) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে—তারা নিরপেক্ষ থাকতে পারছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তবে এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ১৯৫৬ সালে মাত্র সাতটি দেশ নিয়ে ইউরোভিশন শুরু হয়, যাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি আর না ঘটে এবং ইউরোপের দেশগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসে। কিন্তু আজ সেই প্রতিযোগিতাই অনেক সময় দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
তবুও সব বিতর্কের মধ্যেও ইউরোভিশনের জনপ্রিয়তা কমেনি। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ এটি দেখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গান আর বিনোদনের পাশাপাশি এখন এটি দেশগুলোর সম্পর্ক, মতপার্থক্য এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিফলনও। সর্বপরি বলতে গেলে ইউরোভিশন এখন শুধু গান নয়—এটি সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং বাস্তব বিশ্বের একটি মিশ্র প্রতিচ্ছবি।

