টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি ছাড়াই ঈদুল আজহা উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা। চলমান যুদ্ধ, কঠোর সীমান্ত নিষেধাজ্ঞা এবং গবাদিপশু আমদানিতে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারও এই ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। একই সাথে মক্কায় গিয়ে পবিত্র হজ পালনের আজীবনের লালিত স্বপ্নও ভেস্তে গেছে হাজার হাজার গাজাবাসীর।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি শরণার্থী তাঁবুতে বসে ৬৪ বছর বয়সী নাজিয়া আবু লেহিয়া তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিচারণ করছিলেন। এক বছর আগে যুদ্ধের কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকায় তাদের একসঙ্গে হজে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, এর মধ্যেই তার স্বামী মারা যান। অশ্রুসজল চোখে নাজিয়া বলেন, যুদ্ধের আগেই তাদের নাম হজের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ সবকিছু ওলটপালট করে দিল। এখন কেবল মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মক্কার হাজিদের ভিডিও দেখেই চোখের জল ফেলছেন তিনি।
২০২৩ সালে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, প্রতি বছর গাজা থেকে অন্তত তিন হাজার মানুষ হজ পালন করতে পারতেন। গত অক্টোবর মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর গাজাবাসীদের মনে চলাচলের পথ উন্মুক্ত হওয়ার আশা জেগেছিল কিন্তু ইসরায়েলের অব্যাহত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে সেই আশা দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় গত ফেব্রুয়ারিতে মিশরের সঙ্গে গাজার প্রধান প্রবেশদ্বার রাফাহ ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। তবে সেখান দিয়ে প্রতি সপ্তাহে কেবল মাত্র কয়েক শ’ অসুস্থ মানুষ এবং তাদের সাথে অল্প কিছু ব্যক্তিকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
গাজার হামাস নিয়ন্ত্রিত সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার ৩০৪ জন মানুষ গাজায় যাতায়াত করতে পেরেছেন, যা প্রত্যাশার এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম। অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাত জানিয়েছে, রাফাহ ক্রসিং দিয়ে কেবল মানবিক কারণে যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে এবং ভ্রমণকারীদের তালিকা মিশরীয় কর্তৃপক্ষ ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা দ্বারা অনুমোদিত হয়।
হজ পালনের সুযোগ হারানোর পাশাপাশি এবারও কোরবানি দেওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গাজাবাসীরা। গাজার কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে গাজার গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানকার খামার, পশুপালন কেন্দ্র, পশু চিকিৎসা কেন্দ্র এবং ফিড গুদামগুলো একের পর এক হামলায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতি বছর ঈদুল আজহার মৌসুমে গাজায় ১০ থেকে ২০ হাজার বাছুর এবং ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভেড়া আমদানি করা হতো। কিন্তু এবার কোনো গবাদিপশু আসার সুযোগ নেই।
কোগাত দাবি করেছে, তারা মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহে সহায়তা করছে, তবে কোনো জীবিত পশুর চালান গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে হামাস জানিয়েছে, মে মাসে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।
সূত্র: আরব নিউজ

