ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে চাপে ওয়াশিংটন?

0
ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে চাপে ওয়াশিংটন?

আসন্ন বেজিং সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। ইরান যুদ্ধের জেরে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে টান পড়ায় এই সম্মেলনে ওয়াশিংটনের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ফুরিয়ে আসায় বেইজিংয়ের পাল্লা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারী।

এবারের এই ঐতিহাসিক সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে রয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম কোনো পেন্টাগন প্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বেইজিং সফরে এলেন। যা এই সফরের সামরিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে দেয়। তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতার আড়ালে বড় দুঃশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন সমরাস্ত্রের মজুদ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আমেরিকা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ক্রুজ মিসাইলের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে আমেরিকা তাদের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করে ফেলেছে। বর্তমান মজুদ দিয়ে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও চীনের মতো সমপর্যায়ের শক্তির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই করার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পেন্টাগনের তাকগুলো পুনঃরায় ভরতে অন্তত এক থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে ধরণের সংকটের মুখে রয়েছে, তা কেবল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ যেমন গ্যালিয়াম, অ্যান্টিমনি এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের সরবরাহের ওপর চীনের একক আধিপত্য রয়েছে। বিশ্ববাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ খনিজ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বেইজিং। ফলে নিজের সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করতে আমেরিকাকে পরোক্ষভাবে চীনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খনিজ সম্পদের এই সরবরাহকে চীন একটি শক্তিশালী দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। যদিও ট্রাম্প সবসময় একটি সুবিধাজনক চুক্তির খোঁজ করেন, তবে শি জিনপিংয়ের হাতে থাকা এই দুর্বলতা মার্কিন নীতিকে নমনীয় করতে বাধ্য করতে পারে। যদি চীন এই রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্প চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যদিও এমন পদক্ষেপ দুদেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারে নিয়ে যাবে, তবুও আলোচনার টেবিলে এর প্রচ্ছন্ন চাপ বজায় থাকবে।

তাইওয়ান প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো উত্তপ্ত ইস্যুগুলোতেও এই অস্ত্র সংকটের প্রভাব পড়তে পারে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের হুমকিও দিয়ে রেখেছে। আমেরিকার মনোযোগ এবং সমরাস্ত্রের মজুদ মধ্যপ্রাচ্যে আটকা পড়ে আছে, তাই এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। এটি চীনকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন হয়তো এই মুহূর্তে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের ঝুঁকি কম বলে মনে করছে, তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যে বেশি শক্তি ব্যয় করছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল আত্মঘাতী হতে পারে। যদি আমেরিকার মিত্র দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে, তবে এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব দ্রুত ম্লান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি সামরিক শক্তির চেয়ে চীনের অর্থনৈতিক ও খনিজ প্রভাবই হয়তো শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে এই অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here