তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামীকাল শনিবার থেকে দেশব্যপী শুরু হতে যাচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ববধানে আয়োজিত এই নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচী ক্রীড়া পরিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। আশির দশকের বহুল জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষন কর্মসূচী ‘নতুন কুঁড়ি’র সফলতার ধারাবাহিকতায় আগামী দিনের খেলোয়ার তৈরির একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’কে দেখা হচ্ছে।
শনিবার সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে প্রধান অতিথি হিসেবে এই কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ভার্চুয়ালি সারাদেশের জেলা স্টেডিয়ামগুলোতে উপস্থিত হাজারো প্রতিযোগীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই নতুন যাত্রার শুভসূচনা করবেন।
লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার মাধ্যমে ১২-১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের সুপ্ত ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষন, বাছাই এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করাই ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’র মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুস্থ, সুন্দর, আত্মবিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম। একইসাথে দলগত চেতনা, নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলাবোধ বৃদ্ধিতেও খেলাধুলা সহায়তা করে।
মেগা এই ক্রীড়া আয়োজনে ৮টি ইভেন্ট অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, এ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোররা তাদের প্রতিভা প্রমানের সুযোগ পাবে।
রেজিষ্ট্রেশনের জন্য খুব অল্প সময় থাকা সত্বেও সারা দেশ থেকে গত ১২-১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৭৯ জন কিশোর-কিশোরী অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৬ জন কিশোর ও ৪৪ হাজার ১৩৩ জন কিশোরী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩২৪ জন আবেদনকারী রয়েছে সিলেট জেলায়। এরপরই ৯ হাজার ৩০৫ রয়েছে চট্টগ্রাম ও ৮ হাজার ৮৯৬ জন রয়েছে ঢাকায়। উপজেলা পর্যায়ে দল গঠনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। আগামী ১৩-২২ মে পর্যন্ত চলবে অঞ্চল ও বিভাগীয় পর্যায়ের লড়াই।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস এর সার্বিক দিক সম্পর্কে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেছেন, অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি কাঠামোর মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতাটি পরিচালনা করা হবে। এজন্য সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। তৃণমূল থেকে প্রতিভা খুঁজে আনতে ইউনিয়ন ও সিটি কর্পোরেশন ওয়ার্ড পর্যায় থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরপর উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক ধাপ পেরিয়ে সেরা প্রতিভারা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করবে।
তিনি আরও বলেন, পুরো বাংলাদেশকে ১০টি শক্তিশালী অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো-ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ। এসব অঞ্চগুলোর মধ্যে বিভিন্ন জেলা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন কমিটি পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে, যাতে কোনো মেধা অবমূল্যায়িত না হয়।
ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টনে প্রতিটি পর্যায়ে নক আউট পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। দাবায় আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ীয় সুইস লিগ পদ্ধতিতে খেলা হবে। ব্যক্তিগত ইভেন্ট এ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্টের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বাছাই (হিট/নকআউট) এবং ফাইনাল রাউন্ডের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ করা হবে।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীদের উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত হারে ভাতা প্রদান করা হবে। প্রতিটি খেলোয়াড়কে জেলা পর্যায় থেকে জার্সি প্রদান করা হবে। প্রতিযোগিতার প্রতিটি পর্যায়ে তাদের স্বীকৃতিস্বরুপ সনদপত্র প্রদান করা হবে।
জাতীয় পর্যায়ে বাছাইকৃত সেরা খেলোয়াড়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও নিজেকে পরিনত করার সুযোগ থাকবে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগও এর মাধ্যমে তৈরি হবে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তিনটি বিশেষ প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছেন।
তিনি জানান, চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিতদের বিকেএসপিতে ভর্তি এবং বিশেষ ক্রীড়া বৃত্তির আওতায় আনা হবে। এছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমাতে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য আঞ্চলিক বিকেএসপিগুলোকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং স্বজনপ্রীতি রুখতে প্রতিমন্ত্রী নিজে একজন সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে মাঠ পর্যায়ে তদারকি করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। একইসঙ্গে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে।
অতীতের পরিকল্পনাহীন অর্থ ব্যয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এখন হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে।”
ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে সব ভুল-ত্রুটি শুধরে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আমি মন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন খেলোয়াড় হিসেবে এই প্রতিভা বাছাই তদারকি করব।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির সংস্কারের এক সাহসী প্রচেষ্টা। যদি সঠিকভাবে এই প্রতিভাদের পরিচর্যা করা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে সকলে আশাবাদী। একইসাথে আগামী দিনের ক্রীড়া উন্নয়নে এই কর্মসূচীকে একটি মাইলফলক হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্র: বাসস

