রাজধানীর নতুনবাজার, ভাটারা ও বারিধারা এলাকায় চলছে এমআরটি-১ ও ৫-এর ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ। চলমান নির্মাণকাজের কারণে এসব এলাকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কাটা থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছে ওইসব সড়কে চলাচল করা সাধারণ মানুষ। আবার দীর্ঘদিন ধরে ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে যান চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একাধিক সংস্থার সমন্বয় করে কাজ করা জটিল হওয়ায় কাজের এই মন্থর গতি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদ্দা থেকে নতুনবাজারগামী সড়কে কোকা-কোলা পয়েন্ট পার হয়ে বারিধারার বাইরোডের বড় অংশ উন্নয়নকাজের কারণে প্রায় অচল হয়ে আছে। ১০০ ফিট মাদানি এভিনিউ, নতুনবাজারসংলগ্ন সড়ক, ভাটারা থানার সামনে, ডিপিডিসি অফিসের সামনের এলাকা—সবখানেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ। ফলে ভাঙাচোরা রাস্তায় প্রতিদিনই যানজট, ধুলাবালি, বৃষ্টির কারণে কাদা এসব যাত্রী ও পথচারীর জন্য নিত্যদিনের দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাঙাচোরা থাকায় সড়কসংলগ্ন ব্যবসায়ীদের অবস্থাও নাজুক।
বারিধারা জে ব্লকের একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী জানান, আগে শুধু বিকেলবেলা যত টাকার নাশতা বিক্রি হতো, এখন ২৪ ঘণ্টা রেস্টুরেন্ট খোলা রেখেও সেই বিক্রি হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরো বলেন, ‘রেস্টুরেন্টের সামনে যদি গাড়ি দাঁড়াতে না পারে, তাহলে মানুষ কিভাবে খেতে আসবে! গাড়ি দাঁড়াতে পারলে ক্রেতা পাওয়া যেত। আল্লাহ জানেন কবে এই অবস্থা থেকে আমরা রক্ষা পাব!’
এই সড়কে রয়েছে গুলশান ফার্নিচার। সেটির শোরুমে গিয়ে দেখা গেছে, ম্যানেজার ও কর্মচারীরা সোফায় বসে ঝিমাচ্ছেন।
তাঁদের কাছে জানতে চাইলে ম্যানেজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসা লাটে উইট্টা গেছে। শোরুম ভাড়া আড়াই লাখ টাকা। অথচ কোনো ক্রেতা নাই। মালিক লস দিতে দিতে ক্লান্ত। এটা ছিল ব্যবসার একটা ভালো পয়েন্ট। কিন্তু রাস্তা কাটার পর সব শেষ। এই রাস্তার সব দোকানের একই অবস্থা।’
মূল সড়কের পাশের গলির বারিধারা ৩ নম্বর সড়কের ইব্রাহিম ইলেকট্রিকের মালিক ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘মানুষ তো এদিকে আসতেই পারতেছে না। কেনাবেচা কোত্থেকে হইবো! অনেকে রাস্তাই বুঝতেছে না, কোন দিক দিয়া ঢুকবো। টাকা খরচ করে কেউ কি এত ঘুরে খুঁজে খুঁজে দোকানে আসবে? দ্রুত কাজটা শেষ হইলে ভালো হয়।’
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘উন্নয়নকাজে কিছু ভোগান্তি স্বাভাবিক। তবে কাজ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একই এলাকায় ঢাকা মাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের অধীনে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর কাজ একসঙ্গে চলায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। নতুনবাজার-বারিধারা এলাকার সড়ক সংস্কারের কাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে এমআরটি-১-এর প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সারওয়ার উদ্দীন খান জানান, এই অংশে একাধিক জটিল ইউটিলিটি সংযোগের কাজ চলমান থাকায় কাজ শেষ করতে সময় লাগছে।
তিনি বলেন, ‘বারিধারা এলাকার যে বাইরোডটি এখনো ব্যবহারোপযোগী করা যায়নি, সেখানে ড্রেনেজ পাইপ বসানোর কাজ আংশিক সম্পন্ন হয়েছে এবং আরো একটি অংশে পাইপ স্থাপন বাকি রয়েছে, বিশেষ করে থাইল্যান্ড এমবাসির সামনের অংশে। এই কাজ শেষ হওয়ার পর ডেসকোর ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ লাইন ওই অংশ দিয়ে নেওয়া হবে, যা মেইন রোড ক্রস করে অন্য পাশে ১৩২ কেভির বিদ্যমান লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।’
তিনি আরো জানান, এখানে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর মধ্যে সমন্বয় করে অবকাঠামোগত সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ফলে কাজটি তুলনামূলকভাবে জটিল।
কাজের সময়সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ডেসকো, ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, সিটি করপোরেশনসহ একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এসব ইউটিলিটি রিলোকেশন সম্পন্ন করে আগামী আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোনো হচ্ছে। ইউটিলিটিসংক্রান্ত কাজগুলো শেষ হলে সড়কটি প্রাথমিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে দেওয়া হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ শেষ হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে।’
এই কর্মকর্তা জানান, কিছু জায়গায় গাড়ি পার্ক করা, বিশেষ করে থানার সামনে থাকা গাড়িগুলোর কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এসব সরাতে পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
এমআরটি লাইন-১ : ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেল
দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেল এমআরটি লাইন-১ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯.৮৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এতে ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে। অন্যদিকে নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১.৩৬৯ কিলোমিটার এলিভেটেড রুট নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-৫ : পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ
এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) ভাটারা থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এতে ১৪টি স্টেশন থাকবে, যার ৯টি ভূগর্ভস্থ। এই রুট চালু হলে ভাটারা থেকে হেমায়েতপুর যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩২ মিনিট। প্রতিদিন ১২ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। ছয়টি লাইনের এই নেটওয়ার্ক চালু হলে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। তবে এই উন্নয়নকাজের সময় অবশ্যই জনভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। প্রয়োজনে চালু করতে হবে বিকল্প সড়কব্যবস্থা।
সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

