পর্যটন নগরী কক্সবাজার ভ্রমণে এসে বার্মিজ আচার কিনে বাড়ি ফেরা যেন অনেক পর্যটকের কাছে এক ধরনের অলিখিত রীতি। সৈকত নগরী থেকে বিদায়ের আগে পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যাগভর্তি আচার কিনে নেয়ার দৃশ্য প্রায় দেখা যায়। কিন্তু পর্যটকদের সেই বহুল কাঙিক্ষত ‘বার্মিজ আচার’-যে আদৌ মিয়ানমারের নয়, সে তথ্য অনেকেরই অজানা। শুধু আচার নয়, প্রচলিত অন্যান্য পণ্যও বার্মিজ নামে অহরহ বিক্রি হচ্ছে কক্সবাজারে।
কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের ধারণা, মিয়ানমার থেকে আসা ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ আচারই কিনছেন। অথচ বাস্তবে সেসব পণ্যের বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন কারখানা কিংবা কক্সবাজারের স্থানীয় কোন ঝুপড়ি ঘরে।
সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী সৈকত এলাকা এবং শহরের বিভিন্ন বার্মিজ মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, দোকানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের আচার, মরিচের আচার, তেঁতুল, জলপাই ও বরইয়ের আচারসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী। অনেক পণ্যের মোড়কে বার্মিজ ভাষা, মিয়ানমারের ঠিকানা কিংবা ‘মেইড ইন মিয়ানমার’ লেখা থাকায় ক্রেতারা সহজেই এগুলোকে বিদেশি পণ্য বলে ধরে নিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বৈধ বাণিজ্য কার্যক্রম প্রায় স্থবির। রাখাইন রাজ্যের সংঘাত, সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতি এবং টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় মিয়ানমার থেকে আচার আমদানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ ‘বার্মিজ আচার’ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে।
সুগন্ধা এলাকার ব্যবসায়ী আরফিন মিয়া জানান, পর্যটকদের চাহিদা বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে তৈরি আচারই বিক্রি করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈধ পথে মিয়ানমার থেকে এসব পণ্য আসছে না। খুব অল্প পরিমাণ পণ্য অবৈধ পথে প্রবেশ করলেও সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, সৈকত এলাকার বেশিরভাগ দোকানি শহরের পাইকারি বাজার থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করেন।
শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ী আসহাব উদ্দিন জানান, বর্তমানে কক্সবাজারের বাজারে বিক্রি হওয়া আচারের প্রায় অর্ধেক ঢাকার মিরপুর ও কেরানীগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত। ‘হাইকো’, ‘মারমেইড’ ও ‘নাম্বার ওয়ান’সহ বিভিন্ন নামে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য অংশ কক্সবাজার শহরের লাইট হাউস ও লারপাড়া এলাকায় উৎপাদন হয়।
দোকানিরা বলছেন, বহু বছর ধরে কক্সবাজারের সঙ্গে বার্মিজ আচারের একটি পরিচিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখনও সৈকত ভ্রমণ শেষে এসব পণ্য খুঁজে বেড়ান।
বার্মিজ মার্কেটের ব্যবসায়ী মোস্তফা মিয়া বলেন, অনেকের কাছে কক্সবাজার সফর মানেই বাড়ি ফেরার সময় বার্মিজ আচার সঙ্গে নেয়া।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় চার শতাধিক দোকানে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার আচার বিক্রি হয়। মিয়ানমার থেকে বৈধভাবে পণ্য না এলেও পুরোনো পরিচিতির সুযোগ নিয়ে এখনও বার্মিজ পণ্যের নামে ব্যবসা চলছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাসান আল মারুফ বলেন, বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ আচারই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। পণ্যের প্রকৃত উৎস ও উৎপাদন তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করে বিদেশি পণ্যের পরিচয়ে বিক্রি করা হলে তা ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

