পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। দলটির একটি অংশের বিদ্রোহী অবস্থান এবং বেশ কয়েকজন মুসলিম বিধায়কের সেই শিবিরে যোগ দেওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, দলটির নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৩৪ জন মুসলিম। এর মধ্যে ১৭ জন বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া বিধায়কদের মধ্যে রয়েছেন জাবেদ আহমেদ খান, আখরুজ্জামান, সাবিনা ইয়াসমিন, গোলাম রাব্বানী, নিয়ামত শেখ, ইমানি বিশ্বাস, গুলশান মল্লিক ও মো. তৌসিফুর রহমানসহ আরও কয়েকজন।
বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে বিধানসভার স্পিকারের কাছে একটি স্বাক্ষরিত চিঠি জমা দেওয়া হয়েছে। এতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, “১৮তম বিধানসভায় ঘাসফুল প্রতীকে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আমরাই প্রকৃত বিরোধী দল।”
একসময় দলীয় সিদ্ধান্তে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী মমতা ব্যানার্জিকে এখন কেবল পরামর্শদাতা হিসেবে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে বিদ্রোহী শিবির। এ বিষয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “মাননীয় মমতা ব্যানার্জিকে আমাদের পরিষদীয় দলের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়ক শিউলি সাহা বলেন, “তিনি পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন, আমাদের পরামর্শ দিন এবং আমাদের কাজ করতে দিন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিভাজন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, মমতা ব্যানার্জি বর্তমানে আগের মতো ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। ফলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশও তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের ধারণা, বর্তমান নেতৃত্বের বাইরে গেলে তারা বেশি নিরাপত্তা পাবে।
বুধবার বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়েও দলের ভেতরে মতবিরোধ দেখা যায়। সূত্রগুলোর দাবি, মমতা ব্যানার্জির পছন্দ ছিল শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করা। তবে দলের একটি বড় অংশ সেই অবস্থানের বিপরীতে অবস্থান নেয়।
অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী বলেন, মুসলিম সমাজের মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হবে বলে আমরা ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির প্রতি আগের মতো সমর্থন আর নেই। অনেকের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক বিধায়ক এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীরও দলটির ভাঙন নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, একটি দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হয়েও যদি অন্যদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতেই পারে।
বৃহস্পতিবার তিনি আরও বলেন, মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনে জয়ী হলে এবং নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারলে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

