দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ফের অস্বস্তি নেমে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানিসংকটের কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ২.৮২ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই খাত এখন বহুমুখী সংকটে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে তিন হাজার ১৭২ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে রপ্তানি কমেছে ৩.৬৮ শতাংশ এবং ওভেন খাতে কমেছে ১.৮৩ শতাংশ। বিশেষ করে প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি ৪.৩৮ শতাংশ কমে যাওয়ায় পুরো খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ইইউভুক্ত দেশগুলোতে যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এই অঞ্চলে রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৫৫৪ কোটি ডলারের পোশাকপণ্য। কিন্তু ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ধীরগতি, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের অনেক দেশে এখনো জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও বাসাভাড়ার বাড়তি চাপের কারণে সাধারণ মানুষ পোশাকসহ অপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের ওপর।
এদিকে শুধু ইউরোপ নয়, অপ্রচলিত বা নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারেও রপ্তানি কমেছে। গত ১০ মাসে এসব বাজারে রপ্তানি আয় ৫.৮৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫১৬ কোটি ডলারে। যদিও অপ্রচলিত বাজারগুলো বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১৬ শতাংশের ভোক্তা, তবু সেখানে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি আসেনি। তবে কিছুটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের বাজারে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়ে ৬২৯ কোটি ডলার, কানাডায় ১০৯ কোটি ডলার এবং যুক্তরাজ্যে ৩৬৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি ইউরোপীয় বাজারের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।
গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর কাঁচামাল কিনতেও অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা আগের তুলনায় বেশি দাম দিতে রাজি নন। বরং তাঁরা কম মূল্যে পণ্য কিনতে চাচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রপ্তানিকারকরা পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান লাভের পরিবর্তে টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
একই সঙ্গে জ্বালানির সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। শিল্পাঞ্চলগুলোয় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্প মালিকরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন করতে হওয়ায় দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাও কমে যাচ্ছে।
পোশাকশিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দ্রুত বিকল্প উৎসর দিকে ঝুঁকে পড়ে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, ভারত, চীন, তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত প্রতিযোগী হিসেবে উঠে এসেছে। এসব দেশের অনেক কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় তারা কম খরচে দ্রুত উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে।
নিট পোশাক খাতের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে ইহসান শামীম বলেন, ‘ইউরোপে অর্থনৈতিক ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। এর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনায় সহজীকরণ নিশ্চিত করা এবং ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
সব মিলিয়ে বলা চলে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা খাতটিকে বড় চাপে ফেলেছে। তবে সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বাজার বৈচিত্র্যের মাধ্যমে এই খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

