গাজীপুরের ভাওয়ালের বিস্তীর্ণ গজারি বনে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। আগুনে পুড়ে ধ্বংস হচ্ছে বনের জীববৈচিত্র্য, মারা যাচ্ছে সরীসৃপ, পাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণী। নষ্ট হচ্ছে নতুন চারা ও ঔষধি উদ্ভিদ। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের অভিযোগ, অব্যবস্থাপনা, অসতর্কতা এবং কখনো পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ায় বনাঞ্চলটি ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে ফাল্গুন মাস এবং শুষ্ক মৌসুম চলায় বনে আগুন লাগার আশঙ্কা বাড়ছে। বন কর্মকর্তাদের দাবি, অনেক সময় দুষ্কৃতকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবেও আগুন দেয়। বনে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গাছ, ঔষধি উদ্ভিদ এবং বিরল লতা-গুল্ম রয়েছে। আগুনে এসব উদ্ভিদ পুড়ে গেলে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বঞ্চিত হবে।
বনের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানে আগুনে শাল-গজারি গাছের গোড়া পুড়ে গেছে। কোথাও নতুন চারা গাছ পুড়ে শুকনো পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগুনের ছোঁয়া থেকে রক্ষা পায়নি বনের প্রায় কোনো অংশই। জেলায় প্রায় ৬৫ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। ভাওয়াল, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, রাজেন্দ্রপুর ও কাঁচিঘাটা রেঞ্জ অফিসের মাধ্যমে এসব বনভূমি তদারকি করা হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দুষ্কৃতকারী ও মাদকসেবীরা অনেক সময় বনের ভেতরে বসে মাদক সেবন করে। চলে যাওয়ার সময় সিগারেট বা বিড়ির অবশিষ্ট অংশ ফেলে দেয়। সেখান থেকেও আগুন লাগতে পারে। এছাড়া বনের আশপাশের জমির মালিকেরা জমির সীমানা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাগান পরিষ্কারের অজুহাতে আগুন দিতে পারে।
এদিকে এক শ্রেণির বনখেকো রাতের আঁধারে গজারি গাছ কেটে বিক্রি করছে। সম্প্রতি শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নে গালদাপাড়া গ্রামের গজারি বন থেকে রাতের অন্ধকারে গজারি গাছ কেটে নেওয়ার সময় গ্রামবাসী কয়েকটি গাছ আটক করে। পরে বন কর্মকর্তাদের খবর দিলে বিট অফিসার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা গাছগুলো জব্দ করেন।
উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, বাগান পরিষ্কারের নামেও অনেক সময় গজারি বনে আগুন দেওয়া হয়। শুকনো পাতা ও আগাছা দ্রুত সরাতে আগুনকে সহজ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের গতি বেশি থাকায় ছোট আগুনও দ্রুত বড় আকার নেয়। এতে বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, বনের ভেতরে একসঙ্গে একাধিক স্থানে আগুন লাগার ঘটনা প্রমাণ করে অনেক সময় তা পরিকল্পিতভাবে দেওয়া হয়। এতে শুধু বনই নয়, বন্যপ্রাণী ও কীটপতঙ্গও মারা যাচ্ছে। নতুন চারাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আগুন লাগলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, বনাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। গ্রামবাসী ও স্থানীয়দের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো গেলে এ ধরনের ক্ষতিকর কাজ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ গঠন করে বন রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। বন বাঁচাতে বন বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নজরদারিও বাড়াতে হবে।
গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, গাছপালা ধ্বংস হলে পরিবেশ থেকে কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণের ক্ষমতা কমে যায়। গাছ পুড়িয়ে দিলে কার্বনডাইঅক্সাইড আবার পরিবেশে ফিরে আসে, ফলে দূষণ বাড়ে। একই সঙ্গে যেখানে গাছপালা পুড়ে যায় সেখানে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও নষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে শাল-গজারি বনে আগুন লাগায় মূল্যবান গাছপালা, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুল ক্ষতির মুখে পড়ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।
শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান বলেন, বন বিভাগ থেকে আগুন ধরানোর কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় মাদকসেবীরা বনের ভেতরে বসে মাদক সেবনের সময় অসতর্কতায় আগুন লাগতে পারে। আবার আশপাশের জমির মালিকেরা জমির সীমানা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেও এমন কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, বনে আগুন না দেওয়ার জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হয় এবং জনগণকে সচেতন করা হয়। কোথাও আগুন লাগার খবর পাওয়া গেলে দ্রুত টিম পাঠিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ) এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুষ্কৃতকারীরাই বনে আগুন দেয়। অনেক সময় বন ধ্বংস করে খালি জায়গা তৈরি করলে পরে সেখানে দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। এজন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে সবসময় সতর্ক নজরদারি রাখা হচ্ছে। বনের ভেতরে ফায়ার লাইনও তৈরি করা হয়েছে, যাতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না ঘটাতে পারে।

