অ্যান্টার্কটিকায় পর্যটকের ঢল, বাড়ছে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি

0
অ্যান্টার্কটিকায় পর্যটকের ঢল, বাড়ছে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি

তুষারে ঢাকা জনমানবহীন শ্বেত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় গত কয়েক বছরে পর্যটকদের আনাগোনা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই ঘটনা পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। 

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যান্টার্কটিকা ট্যুর অপারেটরসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৮০ হাজার পর্যটক এই মহাদেশে পা রেখেছেন এবং আরও ৩৬ হাজার পর্যটক জাহাজে চড়ে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। গত তিন দশকে এই অঞ্চলে পর্যটনের হার প্রায় দশ গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্টস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক দশকে এই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টার্কটিক আইন বিষয়ক সিনিয়র লেকচারার হ্যান নিলসেন জানান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বরফে চলার উপযোগী জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটন খরচ কমছে। তার সহকর্মীরা ধারণা করছেন, আগামী কয়েক বছরে বার্ষিক দর্শনার্থীর সংখ্যা তিন থেকে চার লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই মহাদেশের চিরচেনা রূপ বদলে যাওয়ার আগেই তা দেখে নেওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে পর্যটকদের মধ্যে।

সম্প্রতি এমভি হন্ডিউস নামক একটি পর্যটকবাহী জাহাজে বিরল ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ওই জাহাজ থেকে অ্যান্টার্কটিকার মূল ভূখণ্ডে কোনো দূষণ ছড়ানোর সরাসরি প্রমাণ মেলেনি, তবে গবেষকরা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা যাযাবর পাখিদের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে এভিয়ান ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ঘটনা পর্যটকদের আচরণবিধি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম আরোপ করতে বাধ্য করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

অ্যান্টার্কটিকার ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থানকে আক্রমণাত্মক প্রজাতি এবং ক্ষতিকর জীবাণু থেকে রক্ষা করতে বর্তমানে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত কঠোর নিয়ম জারি রয়েছে। দর্শনার্থীদের বন্যপ্রাণী থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা এবং পা ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অংশ দিয়ে মাটি স্পর্শ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যটক ও ক্রু সদস্যরা মহাদেশে নামার আগে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, জীবাণুনাশক এবং ব্রাশ ব্যবহার করে তাদের জুতো ও পোশাক থেকে প্রতিটি ধূলিকণা বা বীজের অস্তিত্ব মুছে ফেলেন। পর্যটন গাইডদের মতে, সামান্য অবহেলায় বুটের ফিতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো বীজ বা জীবাণু এই তুষার রাজ্যের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে।

সাধারণত ক্রুজ জাহাজগুলোতে নোরোভাইরাসের মতো সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়ানোর নজির রয়েছে, যেমনটা ২০২০ সালে ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সময় দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে এমভি হন্ডিউস জাহাজে যে ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে, সেটির উৎস সন্ধানে কাজ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি তদন্ত করে দেখছে যে জাহাজে মানুষের থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটেছে কি না। ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তি জাহাজে ওঠার আগেই সংক্রমিত ছিলেন এবং জাহাজে কোনো ইঁদুর বা এ জাতীয় প্রাণীর অস্তিত্ব না থাকায় সংক্রমণ ছড়ানোর মাধ্যম নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

অ্যান্টার্কটিকা মূলত ১৯৫৯ সালের অ্যান্টার্কটিক চুক্তির অধীনে পরিচালিত হয়, যা এই অঞ্চলটিকে কেবল শান্তিপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো মহাদেশটির পরিবেশগত এবং নান্দনিক মূল্য অক্ষুণ্ণ রাখা। বর্তমান সময়ে পর্যটনের এই ব্যাপক প্রসারের ফলে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ এবং কঠোর জৈব-নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলা কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। তবে চুক্তিটি যখন স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন পর্যটকদের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেক কম ছিল।

জাপানের হিরোশিমায় অনুষ্ঠিতব্য অ্যান্টার্কটিক চুক্তি পরামর্শক সভার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গবেষক ও পরিবেশবাদীরা। সেখানে পেঙ্গুইন, তিমি, সিল এবং সামুদ্রিক পাখিদের সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরির দাবি জানানো হবে। বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকার খাদ্যশৃঙ্খলের মূলে থাকা ক্রিল নামক ক্ষুদ্র প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ক্রমবর্ধমান মানুষের পদচারণা কীভাবে এই আদিম পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা নিয়ে বিশ্বনেতাদের নতুন করে ভাবার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব সীমাবদ্ধতা এবং ঝুঁকি সত্ত্বেও এই হিমশীতল প্রান্তরের মোহ পর্যটকদের টেনে আনছে বারবার। পরিবেশবিদদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার মাটিতে মানুষের একটি পায়ের ছাপ দীর্ঘ ৫০ বছর পর্যন্ত মুছে যায় না, যা প্রমাণ করে এই অঞ্চলের প্রকৃতি কতটা সংবেদনশীল। পর্যটনের নামে এই শুভ্র মহাদেশের পবিত্রতা যেন নষ্ট না হয় এবং এখানকার বন্যপ্রাণীরা যেন কোনো মারণঘাতী ভাইরাসের শিকার না হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: এপি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here