অস্ত্র রপ্তানিতে ভারতের রকেট গতি, ১২ বছরে প্রবৃদ্ধি ৫৫ গুণ

0
অস্ত্র রপ্তানিতে ভারতের রকেট গতি, ১২ বছরে প্রবৃদ্ধি ৫৫ গুণ

একসময় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে শীর্ষ অবস্থানে ছিল ভারত। এখনও আমদানির তালিকায় তাদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য হলেও বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের অবস্থান পাল্টাতে দৃঢ়ভাবে এগোচ্ছে দেশটি। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান এখন ১৯তম। ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করছে তারা। বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে ধীরে ধীরে উদীয়মান রপ্তানিকারকে রূপান্তরের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি আয় ছিল ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপি, যা তাদের জন্য রেকর্ড। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ২৩ হাজার ৬২২ কোটি রুপি। তার মানে প্রতিরক্ষা রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে রপ্তানি আয় তিন গুন বেড়েছে। এক দশক আগে, মানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৮৬ কোটি রুপি। ১২ বছরে এটা ৫৫ গুন বেড়েছে, শতাংশের হিসাবে ৫ হাজার ৫০০ ভাগ! মানতেই হবে একযুগে প্রতিরক্ষা রপ্তানি খাতে যুগবদল হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় ভারতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত এখন প্রতিরক্ষা। 

প্রতিরক্ষা রপ্তানির রকেট গতির পেছনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও জ্বালানি জুগিয়েছে। রেকর্ড রপ্তানিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর অবদান ২১ হাজার ৭১ কোটি রুপি আর বেসরকারি খাতের অবদান ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি রুপি। রপ্তানিতে রেকর্ডের পাশাপাশি রেকর্ড হয়েছে উৎপাদনেও। গত অর্থবছরে ভারতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ১.৭৮ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। ভারত সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৫০ হাজার কোটি রুপিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রবৃদ্ধির যে ধারা, তাতে এ লক্ষ্যমাত্রা খুব অর্জনযোগ্য। 

একসময় ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। এখন স্টার্টআপ, এমএসএমই, বেসরকারি উৎপাদক, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা পালন করছে। ভারতের অন্তত ১৪৫টি প্রতিষ্ঠান এখন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি করে।

আগে ভারত কেবল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা ছোটখাটো যন্ত্রাংশ রপ্তানি করতো। এখন সে তালিকায় যুক্ত হয়েছে হাইটেক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আকাশ মিসাইল সিস্টেম, অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার, প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স, সফ্‌টওয়্যার, কামান, রকেট লঞ্চার, নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও ভেসেল, সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, রাডার, সেন্সরসহ উচ্চপ্রযুক্তির বহুমুখী সামগ্রী। 

রপ্তানিতে রেকর্ড হলেও ভারতের সামগ্রিক রপ্তানিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের অবদান এখনও সামান্যই। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে এখানে কৌশলগত গুরুত্বটা অনেক বেশি। এই সাফল্য আসলে ভারতের প্রতিরক্ষা পণ্যের প্রতি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আস্থা এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে আরো দৃঢ় করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি কেবল উৎপাদন পরিমাণের মধ্যে সীমিত রাখলে সামনের চ্যালেঞ্জ জেতা যাবে না। এখন মনোযোগ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি থেকে সরিয়ে সক্ষমতার গভীরতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। ভারতের সবচেয়ে বড় সুযোগ এখন নিজস্ব নকশা, ইঞ্জিনিয়ারিং উৎকর্ষ, উন্নত উপকরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করার মধ্যেই নিহিত।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ও রপ্তানির রেকর্ড রাতারাতি হয়নি, আকাশ থেকেও পড়েনি। সরকারের ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় নিবিড় মনোযোগ, পণ্য বৈচিত্র্য, সক্ষমতা বাড়ানোর আন্তরিক চেষ্টার হাত ধরেই এসেছে এই সাফল্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here