অন্তর্বর্তীর অদক্ষতায় ফোকলা অর্থনীতি

0
অন্তর্বর্তীর অদক্ষতায় ফোকলা অর্থনীতি

ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নোবেলজয়ী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। থ্রি জিরোর প্রবক্তা হিসেবে জগেজাড়া খ্যাতি। কিন্তু বিশেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসে বিদায়বেলায় দেশকে অনেকটাই ভঙ্গুর করে রেখে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শ্রুতিমধুর বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ব বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখানো যত সহজ; দেশ চালানো যে ততটাই কঠিন তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের বদলে আরো ‘বিশৃঙ্খলায়’ রেখে গিয়ে তারই প্রমাণ দিয়েছেন। তিনিসহ নিজের সহকর্মী আরো ‘তিন ডক্টরেট’ অর্থনীতিবিদও দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে টেনে তোলার বদলে অনেকটাই ডুবিয়েছেন বলে বিভিন্ন মহল থেকে ‘কড়া’ সমালোচনা চলছে। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা—কেউ আর তাঁর সমালোচনায় রাখঢাক করছেন না। সবকিছুতে ব্যর্থতার পুরো দায়ভার তাঁকে দিয়ে পারলে একেবারেই ধুয়ে দিচ্ছেন।

তাঁরা মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, রেকর্ড ঋণখেলাপি, বিনিয়োগখরা, কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব, ব্যবসায় মন্দা, গতিহীন রপ্তানি, দেশবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি, বন্দর বিদেশিদের তুলে দেওয়া, বিশাল রাজস্ব ঘাটতিসহ অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে পারেননি ড. ইউনূস। বরং তিনি অর্থনীতিকে ‘ফোকলা’ বানিয়ে তা বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গেছেন। স্বাস্থ্যসেবা খাতে টিকায় বরাদ্দ রাখেননি, বরং প্রকল্প বন্ধ করেছেন। জ্বালানির আপৎকালীন কোনো প্রস্তুতি রেখে যাননি।

আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন প্রায় শূন্য তহবিল আর বিশাল ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত-ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মানুষের অনেক আশা ছিল, এই ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নেবেন। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ—সবাই আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু সবকিছুতে নির্লিপ্ত-নির্বিকার থাকায় দেশে এক ধরনের নৈরাজ্য শুরু হয়। পুরো সময়কালে একবারের জন্যও শীর্ষ ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির যাঁরা মূল নায়ক, তাঁদের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি, বিনিয়োগ করা বা ব্যবসা প্রসারে কোনো আশ্বাসও দেননি।

ফলে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায়, হতাশায় সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, ‘ড. ইউনূসের গভর্নমেন্ট তো গভর্নমেন্ট ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে মোস্ট ওয়াস্টেস্ট গভর্নমেন্ট। এটা মাস্তান পার্টির মতো কাজ করেছে। এ সরকার গোটা জাতিকে কয়েক দশকের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে। ড. ইউনূস টাকা-পয়সা ভালোবাসেন। পাওয়ার ভালোবাসেন। তিনি মানি লাভার, পাওয়ার লাভার। ট্যাক্স দিতে চাননি। তিনি যেসব লোক নিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই সরকার সম্পর্কে দেশ চালানোর ক্ষেত্রে জ্ঞান-বুদ্ধি ছিল না।’

সিনিয়র ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ‘এ জাতির সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা করা হয়েছে। এত ভালো ভালো লোক আমাদের সঙ্গে এটা কী করল! এই জাতির তো বারোটা বাজানো হলো। এর তো কোনো আইন নেই। উনাদের খুশি মনে আনলাম। ব্যবসায়ীরা তো পাত্তাই পাচ্ছিল না কার কাছে যাবে। শুধু ওই বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ছাড়া কাউকে তো ডাকা হয়নি। আমি নিজে প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি যে আপনাকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনগেজ হতে হবে। করা হয়নি।’

বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্বের ১৮ মাসের শাসনামলে ব্যবসায়ীদের অবজ্ঞা-অবহেলা, হয়রানিমূলক মামলা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, কারখানা বন্ধ করে লাখো লোকের চাকরি হারানো, পুঁজিবাজারকে তলানিতে নামিয়ে দেওয়া আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে সাধারণ মানুষের জীবনকে একেবারে বিষিয়ে তোলা হয়। এ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ শতাংশ। উচ্চ সুদের হারে বিনিয়োগে স্থবিরতা চরমে। ওই সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে এসে ৫৮ শতাংশ কমে যায়। দেশের বড় বড় প্রকল্প বন্ধ রেখে, এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড অদক্ষতা অথচ বিদেশি ঋণ বা ধারকর্জে কয়েক গুণ বেশি পারদর্শিতা বাংলাদেশকে এগোনোর বদলে বরং পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতি কিভাবে নাজুক হয়:

তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণে এক অভাবনীয় উল্লম্ফন হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩০ লাখ কোটি টাকায়। মাত্র এক বছরে বাড়ে তিন লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫১ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১.৩০ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২.২১ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১০৩.৪১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ দেড় বছরে বিদেশি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে নীতি সুদহার ছিল ৮ শতাংশের ঘরে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত তা ১০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। সুদের হার বাড়ায় ব্যাবসায়িক ঋণের খরচ বেড়েছে, যা নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। এ সময়ে ৩২৭টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। কর্মহীন হয়েছে দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।

জানা যায়, ড. ইউনূসের সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। তখন চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপণ্যের পেছনেই মানুষের আয়ের বেশির ভাগ ব্যয় হয়ে যায়। এ কারণে ভোক্তারা বিলাসদ্রব্য, ইলেকট্রনিকস বা অন্যান্য শৌখিন পণ্য কেনা কমিয়ে দেয়। এতে ভোক্তার ভোগ কমে যায়, খুচরা ও পাইকারি বাণিজ্যে বড় ধস নামে। অন্যদিকে ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে সমস্যা হওয়ায় শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে খরচ বাড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যাংকঋণের ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদের হার। তখন ব্যবসায়ীদের লোকসানের ভয়ে নতুন করে ব্যবসার প্রসার ঘটানো থমকে যায়। একই সময়ে অনেক ব্যাংক কাঁচামাল আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলতে পারছিল না। বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও তখন এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস মারাত্মক আকার ধারণ করে। যাকে তাকে আক্রান্ত করা হয়। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শিল্পাঞ্চলে বারবার শ্রমিক অসন্তোষ এবং কারখানায় ভাঙচুরের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার দিতে ভয় পাচ্ছিলেন। তাঁরা তাঁদের অর্ডারের একটি বড় অংশ তখন ভারত, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বন্দরে পণ্য খালাস ও কারখানা থেকে শিপমেন্ট দেরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময়মতো অর্থও পাচ্ছিলেন না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে ব্যবসায়ী-উদোক্তারা তখন ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সান্ত্বনা পাচ্ছিলেন না। এমনকি শীর্ষ রপ্তানি শিল্প পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এর নেতারা বারবার প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করার সময় চেয়েও ব্যর্থ হন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও কম্পানিগুলোর উৎপাদন ও বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে করপোরেট কর আদায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দেওয়ায় ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হয়নি। ডলার সংকটের কারণে আর আস্থাহীনতায় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যায়। বন্দরে পণ্য খালাসের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কাস্টমস থেকে প্রাপ্ত শুল্ক আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।

ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মনোযোগ ছিল সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করার চেয়ে ‘ব্যবস্থা পরিষ্কার’ করার দিকে বেশি নজর দেওয়ায় নিয়মিত ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা বা বিশেষ প্যাকেজ তখন অনুপস্থিত ছিল। ব্যবসায়ীরা স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আশা করলেও ড. ইউনূসের সময়ে ‘সংস্কারের দৌড়ঝাঁপ’ ব্যবসায়ীদের নতুন কোনো ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহ করে।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ না দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে। আপৎকালীন জ্বালানি মজুদ অবকাঠামোকে সমৃদ্ধ করায় কোনো নজর ছিল না। এখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে যখন দাম বেড়ে যাওয়া ও পরিবহনে সমস্যায় দেশে যখন জ্বালানি তেলের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে, তখন এর দোষ এসে পড়ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের ওপর। তীব্র জ্বালানিসংকটে সার কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রেশনিং করেও কূল-কিনারা করতে পারছে না সরকার। গ্রামে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। শহরেও এর মাত্রা বেড়েছে। উৎপাদন খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানিকারকরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। অথচ সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার দিনক্ষণ দফায় দফায় পেছায় অন্তর্বর্তী সরকার। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মনোযোগ দেওয়া হলে এত দিনে অন্তত এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতো।

নিট রপ্তানি খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা এক পা-ও এগোইনি। অনেক ব্যাংককে বাড়তি বিপদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ যেটা হয়েছে, ইকোনমিতে প্রাইভেট সেক্টরকে টোটালি ইগনোর করা হয়েছে। কিভাবে দেশ চালাবেন, এটা বোঝার জন্য বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই।’

প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএপিএমইএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। পুরনো ব্যবসাও চলেছে ধুঁকে ধুঁকে। জুলাই আন্দোলনের পর দেশে এমন কোনো ব্যবসা নেই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’

বিতর্কিত বিদেশি চুক্তি:

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যগ্রিমেন্ট’ সই হয় বাংলাদেশের। এর আওতায় পোশাক রপ্তানিতে ট্যারিফ সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকে প্রায় ২১.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য (বোয়িং বিমান, এলএনজি, গম, তুলা) ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে হয়েছে। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে, যেখানে গ্যাসের দাম স্পট মার্কেটের চেয়ে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত বা স্বাক্ষরিত বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি, বিশেষ করে শুল্কমুক্ত সুবিধা হ্রাস বা অসম শর্তের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশি পণ্য (বিশেষ করে পোশাক) আমেরিকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। অথচ এর আগে গড় শুল্ক ছিল ১৫.৭ শতাংশ। অর্থাৎ নামমাত্র ছাড় দিলেও আগের চেয়ে শুল্কের বোঝা বেড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ আমেরিকার প্রায় চার হাজার ৪০০টি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকারের বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে প্রতিবছর প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য বিশেষ করে গম, সয়াবিন, তুলা ইত্যাদি এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানকে আমেরিকার তৈরি ১৫টি বোয়িং বিমান কেনার শর্তও এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চুক্তির কিছু ধারা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শর্ত অনুযায়ী, আমেরিকা চাইলে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারবে। বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যানবাহন ও ওষুধ প্রবেশের ক্ষেত্রে আমেরিকার নিজস্ব সেফটি ও হেলথ স্ট্যান্ডার্ড মেনে নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে একটি অন্তর্বর্তী সরকার কেন এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি এবং বাধ্যতামূলক চুক্তি করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে বিদেশি কম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, দেশের ‘লাইফলাইন’ খ্যাত এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া কেবল জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বরং সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ।

বলা হচ্ছে, বন্দর থেকে অর্জিত আয়ের একটি বিশাল অংশ এখন বিদেশি কম্পানির পকেটে চলে যাবে। আগে যে লাভ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো, এখন তার মাত্র একটি অংশ বাংলাদেশ পাবে। বিদেশি কম্পানিগুলো বন্দরের চার্জ বা ট্যারিফ নির্ধারণে প্রভাব খাটাবে, যার ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের দামের ওপর। কোনো যুদ্ধের সময় বা জরুরি পরিস্থিতিতে বন্দরের ওপর রাষ্ট্রের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ না থাকা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here