মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতে গভীর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা। চলমান সংঘাত দুশ্চিন্তায় ফেলেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবারগুলোকেও। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।
এছাড়াও টানা হামলা, আকাশসীমা বন্ধ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরানে থাকা বহু বাংলাদেশির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে স্বজনদের। এনিয়ে পরিবারে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, কথা বলতে পারছেন না।
দুবাইপ্রবাসী রনি হোসেন বলেন, ‘এখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও খবর দেখলেই ভয় লাগে। কখন যে আবার হামলা করে এর নিশ্চয়তা নেই। পরিবার থেকে বারবার ফোন আসে। আমরা বাইরে কাজ করি ঠিকই, কিন্তু মনে সব সময় একটা দুশ্চিন্তা থাকে।’
হবিগঞ্জের সুন্দর আলীর ছেলে লুৎফুর রহমান প্রায় ছয় বছর ধরে তেহরানে বসবাস করেন। সুন্দর আলী বলেন, আগে প্রতিদিন না হলেও একদিন পরপর কথা হতো। এখন এক সপ্তাহ ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। ফোন বন্ধ, ইন্টারনেটও পাওয়া যাচ্ছে না। খবর দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে।
ফাতেহা বেগমের ছেলে রুমান মিয়া ইরানে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষ ভিডিও কলে কথা হয়েছে যুদ্ধ শুরুর আগের দিন। পরে এক ভয়েস মেসেজ দিয়ে জানিয়েছিল ইরানের একটি স্কুলে বোমা হামলা হয়েছে। এরপর থেকে কোন যোগাযোগ নেই। এনিয়ে তিনি উৎকন্ঠায় আছেন।
বিভিন্ন সূত্র মতে- ইরানে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ হাজারের মতো বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন। তবে সরকারি নিবন্ধিত সংখ্যাটি এর চেয়ে কম।
উপসাগরীয় দেশগুলোতেও আতঙ্ক:
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আকাশসীমা আংশিক বন্ধ ও ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাতায়াতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।.
প্রবাসীরা জানিয়েছেন, সরাসরি যুদ্ধ না হলেও বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থানে চাপা ভীতি কাজ করছে। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরতে চাইছেন, কিন্তু বিমান চলাচল সীমিত থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।
দুই বাংলাদেশি নিহত:
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে নিহত হন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেকা এলাকার ছবর আলীর ছেলে সালেহ আহমেদ এবং বাহরাইনে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ তারেক।
গত শনিবার আরব আমিরাতের আজমানে সন্ধ্যায় সালেহ আহমেদ ইফতার শেষে জরুরি খাদ্য-পানীয় সরবরাহের কাজে বের হন। তখন হঠাৎ আকাশে আগুনের মতো উজ্জ্বল একটি বস্তু দেখা যায়। মুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। গুরুতর আহত অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে মৃত ঘোষণা করা হয়।
সোমবার রাতে বাহরাইনে মোহাম্মদ তারেক একটি ড্রাইডক শিপইয়ার্ডে ডিউটির সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি জাহাজের ওপর পড়লে তিনি মারা যান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত ছয় মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রবাসীরা সতর্ক থাকেন এবং স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেন।
বাংলাদেশ দূতাবাস সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট পুনরায় চালু হলে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
এছাড়াও কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত চারজন বাংলাদেশি হলেন- নবীনগরের আমিনুল ইসলাম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), সাথিয়ার রাবিউল ইসলাম (পাবনা), বেগমগঞ্জের মাসুদুর রহমান (নোয়াখালি) ও চাঁদিনার দুলাল মিয়া (কুমিল্লা)। তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। কুয়েত দূতাবাস নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, এবং দূত নিজেও হাসপাতালে সাক্ষাৎ করেছেন।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, বহু পরিবার দিনরাত ফোনের অপেক্ষায় আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

