ঘটনাটি কানাডার। দেশটিতে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর জলাতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে অবকাশ যাপনের সময় ঘুমের মধ্যে একটি বাদুড় তার নাক ও মুখের ওপর বসে ছিল। তখন শিশুটি সেটিকে হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। শরীরে দৃশ্যমান কোনও ক্ষত না থাকায় পরিবার তাৎক্ষণিক কোনও চিকিৎসা নেয়নি। পরে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের একটি কটেজে বেড়াতে গিয়েছিল ওই পরিবার। এ বিষয়ে প্রকাশিত বিস্তারিত তথ্য কানাডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল-এ সোমবার প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুটির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ঘুম ভাঙার পর সে দেখে একটি বাদুড় তার নাক ও মুখের ওপর বসে আছে। সে হাত দিয়ে বাদুড়টিকে সরিয়ে দিলে তার বাবা একটি পাত্রের মধ্যে সেটিকে ধরে বাইরে ছেড়ে দেন।
ক্ষত না থাকায় চিকিৎসা নেওয়া হয়নি
শিশুটির শরীরে কোনও কামড়ের দাগ বা দৃশ্যমান আঘাত ছিল না। পাশাপাশি বাদুড়টির আচরণও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তাই পরিবার মনে করেছিল চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু ঘটনার ১৯ দিন পর শিশুটির মুখে অসাড়তা ও ফোলাভাব দেখা দেয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রথমে একটি জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, সে বেলস পালসি (মুখের এক পাশের পেশি সাময়িক অবশ হয়ে যাওয়া) রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সে অনুযায়ী হারপিস ভাইরাসজনিত সংক্রমণের জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রথমে তার মুখ ও মাড়ির ভাইরাসজনিত সংক্রমণ (হারপিস জিনজিভোস্টোমাটাইটিস) হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে পরদিন তার মুখের ডান পাশ দুর্বল হয়ে পড়লে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দ্রুত অবনতি ঘটে
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় থাকাকালেই শিশুটির শরীরের তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে তার খাদ্য গিলতে সমস্যা, বিভ্রান্তি এবং দৃষ্টিভ্রম (হ্যালুসিনেশন) দেখা দেয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকেরা তাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তার জন্য ভেন্টিলেশনে দেন এবং শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) ভর্তি করেন।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবার শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই জলাতঙ্কের আশঙ্কা করেন।
পরবর্তীতে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সির পরীক্ষায় বাদুড়বাহিত জলাতঙ্ক ভাইরাসের একটি ধরন শনাক্ত করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ১৭ দিন পর শিশুটির মৃত্যু হয়।
কানাডায় বিরল হলেও প্রাণঘাতী
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির অ্যালার্জি, এঁটুলি পোকা বা টিকের কামড়, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা কিংবা সম্প্রতি দেশের বাইরে ভ্রমণের কোনও ইতিহাস ছিল না।
কানাডায় মানুষের মধ্যে জলাতঙ্কের সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। কানাডিয়ান ভেটেরিনারি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, ১৯২৪ সাল থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেশটিতে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীদের টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকায় জলাতঙ্কের সংক্রমণ খুবই কম। তবে এই কর্মসূচি দুর্বল হলে রোগটি আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাদুড়ের সংস্পর্শে এলেই চিকিৎসা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তি যদি সরাসরি বাদুড়ের সংস্পর্শে আসে, তাহলে শরীরে ক্ষতচিহ্ন থাকুক বা না থাকুক, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রেবিস পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা সম্ভাব্য সংক্রমণের পরপরই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর এই রোগ প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। তাই সম্ভাব্য সংক্রমণের পর দ্রুত প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সূত্র: বিবিসি

