ব্যাংক কোম্পানি আইন থেকে অব্যাহতি পেল শাইনপুকুর সিরামিকস, এলসি খোলার অনুমতি

0
ব্যাংক কোম্পানি আইন থেকে অব্যাহতি পেল শাইনপুকুর সিরামিকস, এলসি খোলার অনুমতি

১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনে শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডকে সোনালী ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের অধীনে বিশেষ অব্যাহতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এই সুবিধা অনুমোদন করেছে। 

শাইনপুকুর সিরামিকস বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান এবং পুরো গ্রুপটি বর্তমানে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত থাকায় এই অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের অধীনে বিশেষ অব্যাহতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এই সুবিধা অনুমোদন করেছে।

এই সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানটি নির্দিষ্টভাবে শিথিল করা হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই ঋণ সুবিধার কারণে ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এই অনুমোদনের ফলে সৃষ্ট কোনো দায়-দায়িত্ব অর্থ বিভাগের ওপর বর্তাবে না।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। বিষয়টি সোনালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে শাইনপুকুর সিরামিকসের এলসি খোলায় নানা জটিলতা দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপির অনুকূলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা দিতে পারে না।

তবে আইনে একটি ব্যতিক্রম আছে। যদি কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠান ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ না হয় অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মনে করে যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল, তবে ওই গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

অন্যভাবে বললে, বেক্সিমকো গ্রুপ ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ায় গ্রুপের অধীন সব প্রতিষ্ঠানই কারিগরিভাবে খেলাপির আওতায় পড়ে। সে অনুযায়ী, শাইনপুকুর সিরামিকসও গ্রুপের সেই অবস্থার আওতায় রয়েছে, যদিও প্রতিষ্ঠানটি নিজে পৃথকভাবে ঋণখেলাপি নয়। এই আইনি জটিলতার কারণেই খেলাপি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সুবিধা দেওয়ার আগে ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বেক্সিমকো গ্রুপের খেলাপি অবস্থার কারণে এ সুবিধা দিতে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, ‘শাইনপুকুর সিরামিকস বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় অব্যাহতি দিয়েছে, যার ফলে শাইনপুকুর সিরামিকস সোনালী ব্যাংকে ১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনের বিপরীতে এলসি খুলতে পারবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পর বিষয়টি বিবেচনা করেছে মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, এই ঋণ সুবিধার কারণে অর্থ বিভাগের কোনো দায়-দায়িত্ব সৃষ্টি হবে না এবং এ বিষয়ে ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক পিএলসি সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা চাইতে পারবে না।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডের সব আয় একটি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। সেখান থেকে আনুপাতিক হারে সোনালী ব্যাংকের পাওনা নিয়মিতভাবে পরিশোধ করতে হবে।

শাইনপুকুর সিরামিকসের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বলেন, ‘বেক্সিমকো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নয়। ২০২৫ সালেও আমরা খেলাপি ছিলাম না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শাইনপুকুর নিজে খেলাপি প্রতিষ্ঠান নয়। তবে গ্রুপের সঙ্গে একই পরিচালকদের থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থাও খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে।’

সোনালী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মূলত শিল্পকারখানার কার্যক্রম ও স্বাভাবিক ব্যবসা পুনরায় চালু করতে এ আবেদন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘গভর্নর আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে চান। সে কারণেই শাইনপুকুর সিরামিকসকে এ সুবিধা দেওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।’

সোনালী ব্যাংক আইনগতভাবে এ সুবিধা দিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ক(৩) ধারা থেকে শাইনপুকুর সিরামিকসকে অব্যাহতি দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় অব্যাহতি দেওয়ায় এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারবে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে যে খেলাপি হওয়া ইচ্ছাকৃত নয় এবং যৌক্তিক কারণে ঘটেছে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল যার মাধ্যমে খেলাপি গ্রাহকদের ব্যাংক অর্থায়নে সুযোগ বাড়ানো হয়েছিল। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের একটি কোম্পানি খেলাপি হলেও অন্য কোম্পানিগুলো ঋণ পেতে পারে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করে যে ওই খেলাপি ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং তা যুক্তিসঙ্গত পরিস্থিতির কারণে হয়েছে।

এই প্রজ্ঞাপনের আগে একটি কোম্পানি খেলাপি হলে একই গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হতো। এই নীতি পরিবর্তন সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েই চলেছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত যেকোনো নতুন নিয়ন্ত্রণমূলক সহায়তা চালুর আগে তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা।

তিনি বলেন, ‘যদি সার্কুলার বা নীতিগত সহায়তা খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যর্থ হয় এবং উল্টো অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ভবিষ্যতে এর পরিণতির দায়ভার বহন করতে হবে।’

সৌজন্যে: টিবিএস  
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here