ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে তিন বছর বয়সী এক শিশুর অলৌকিক উদ্ধার। ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ক্লেইবার মোরান (৩) নামের ওই শিশুকে।
উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং বর্তমানে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া জর্ডানের সিভিল ডিফেন্সের একটি দল শিশুটিকে উদ্ধার করে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে ‘জাতির জন্য আশার উৎস’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ জুন দেশটিতে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জনে। আহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এছাড়া এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উপগ্রহচিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের পর শিশুটিকে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাকে কারাকাসের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, শিশুটির শারীরিক গুরুত্বপূর্ণ সূচক স্বাভাবিক রয়েছে এবং চিকিৎসকরা তার নিবিড় পরিচর্যা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। সেই হিসেবে ছয় দিন পর ক্লেইবার মোরানের জীবিত উদ্ধারকে অত্যন্ত বিরল এবং বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা
উদ্ধার হওয়া শিশুটির বাড়ি লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে, যা ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে অনেক বাসিন্দা নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, লা গুয়াইরায় খাদ্য সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক সেবাগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
লা গুয়াইরার ১৮ বছর বয়সী এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দানিয়েলা আরমাস, যিনি ভূমিকম্পের সময় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে আহত হন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কিছু এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ প্রায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।
জরুরি সহায়তায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রয়োজন
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসে অন্তত ৩০ হাজার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়, সুরক্ষা এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে প্রাথমিকভাবে ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে চরম চাপের মুখে রয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার বলেন, টিকাদানের নিম্ন হার এবং স্বাস্থ্যসেবার সংকটের কারণে হাম, ডিপথেরিয়াসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত
হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, ক্লেইবার মোরানের জীবিত উদ্ধার প্রমাণ করেছে যে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ থাকতে পারে। এ কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো নিরলসভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষিত উদ্ধারকুকুর, ভারী যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভেনেজুয়ায় ৪৭ টন মানবিক সহায়তা পৌঁছেছে। এতে জরুরি চিকিৎসা কিট, নিরাপদ প্রসবসেবা, নবজাতকের চিকিৎসা এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে।
স্বজন হারানোর বেদনায় বিধ্বস্ত মানুষ
উদ্ধার অভিযান চললেও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহতদের দাফন শুরু হয়েছে। তবে এখনো বহু পরিবার তাদের নিখোঁজ স্বজনদের মরদেহের অপেক্ষায় রয়েছে।
লা গুয়াইরা বন্দরের অস্থায়ী মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে উইলকার মোলালা নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি তার বোন, বোনের সন্তান এবং ভাইয়ের সন্তানদের মরদেহ শনাক্ত করার অপেক্ষায় আছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারে মোট ১১ জন ছিল। আমি ও আরেকজন শুধু কর্মস্থলে থাকায় বেঁচে গেছি। বাকি সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে।”
ভয়াবহ এই দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসাসেবা এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকলেও হাজারো পরিবার এখনও তাদের স্বজনদের খোঁজে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি

