ফাঁদে ফেলতে অভিনব প্রলোভন, নিঃস্ব হাজার হাজার তরুণ-তরুণী!

0
ফাঁদে ফেলতে অভিনব প্রলোভন, নিঃস্ব হাজার হাজার তরুণ-তরুণী!

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘অতিথি ডটকম’। আর এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অভিনব প্রতারাণার ফাঁদ পেতে বসেছেন সাইফুল ইসলাম সোহেল। তার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে দেশের হাজার হাজার বেকার যুবক সর্বস্বান্ত হয়েছে। দুই দশক আগে যার প্রতারণা শুরু হয়েছিল ডেসটিনি ২০০০ দিয়ে। এরপর তার মতো প্রতারকদের সহায়তায় ইউনিপেটুইউ, যুবক, এমটিএফই এবং এহসান গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের হাজার কোটি টাকা লুট করেছে।

‘স্মার্ট হোটেল ও রিসোর্ট বুকিং প্রজেক্ট’ হলো তাদের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় প্রতারণার হাতিয়ার। যেখানে তারা দাবি করছে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট এবং সাজেকের বড় বড় অভিজাত হোটেল ও রিসোর্টের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। গ্রাহকদের বলা হচ্ছে, এই বুকিং প্রজেক্টের ‘এজেন্টশিপ’ নিলে পর্যটন মৌসুমের পুরো লভ্যাংশ এজেন্টদের মাঝে বণ্টন করা হবে। অথচ এই নাম দিয়ে তারা লাখ লাখ টাকা অগ্রিম বুকিং বা জামানত হিসাবে নিয়ে নিচ্ছে।

বলা হয়, আন্তর্জাতিকমানের এই ট্রাভেল ও সার্ভিস পোর্টালে বিনিয়োগ করলে ঝামেলামুক্ত বিপুল আয় নিশ্চিত। কেউ চাইলে দ্রুত কোটিপতিও হতে পারবেন। অলীক সব স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো-অতিথি ডটকমের আড়ালে রয়েছে এক অন্ধকার ফাঁদ। ইতোমধ্যে অনেকে এ ফাঁদে আটকা পড়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নীরব। 

২০০০ সালের শুরুতে ডেসটিনি কার্যক্রম শুরু করলে সাইফুল সেখানে একজন সাধারণ কর্মী হিসাবে যোগ দেন। পরে তিনি ‘পিএসডি’ (প্রফিট শেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন) পর্যায়ে উন্নীত হন। ডেসটিনি যখন ভেঙে পড়ে এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তারা জেলে যান, ততদিনে সাইফুল নিজের আখের গুছিয়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে সুযোগ বুঝে সটকে পড়েন। সেই ডেসটিনিরই আদলে ২০১৬ সালে গড়ে তোলেন ‘নোভেরা প্রডাক্টস লিমিটেড’। মিরপুর ডিওএইচএসে আলিশান অফিস খুলে ই-কমার্সের নামে শুরু করেন পিরামিড স্কিম। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই স্কিমের নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন।

নারী নির্যাতন মামলায় পুলিশ সাইফুল ইসলাম সোহেলকে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী থেকে গ্রেফতার করে। তার পালিত পিতার নাম দলিল উদ্দিন। কয়েক মাস জেল খেটে ছাড়া পান। পরে প্রতারণা মামলায় ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল পল্লবী থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশের অরগানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন টিম। ওই বছরের শেষদিকে তিনি ছাড়া পান। ফের তিনি প্রতারণা ব্যবসা শুরু করেন। ই-কমার্স নামে ব্যবসা শুরু করার ঘোষণা দিয়ে পর্দার আড়ালে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন রমরমা এমএলএম কারবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বজিত গুহ এবং মশিউর রহমান নামে আরও দুই ব্যক্তি সাইফুল ইসলাম সোহেলের প্রতারণা মামলার কেইস পার্টনার। ডেসটিনি ও নোভেরা চ্যাপ্টারের পর সাইফুলের ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে বিশ্বজিত গুহ এবং মশিউর রহমানের হাত রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের নিখুঁত পরিকল্পনায় ‘অতিথি ডটকম’ অ্যাপটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে এটি কোনোভাবেই প্রাথমিক দৃষ্টিতে এমএলএম মনে না হয়। সাজানো অ্যাপটির টার্গেট গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবকরা

ডিজিটাল ট্রেডিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির কাল্পনিক প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে জামানত বাবদ। তবে নানা অজুহাতে কোন গ্রাহক কী পরিমাণ জামানত দিচ্ছেন সেটি স্পষ্ট করে কাউকেই জানানো হচ্ছে না। এখানেই তাদের ফাঁকফোকর। এই ফাঁক গলিয়েই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি। সেই সঙ্গে হাই প্রোফাইল লোকজনদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়ে নিজেকে করেছেন সুরক্ষিত। এ কারণেই তারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন অধরা। এছাড়া কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তার জেল পার্টনার প্রতারক এমএলএম কোম্পানি নভেরা প্রডাক্টসের দুই পরিচালক বিশ্বজিত গুহ ও মশিউর রহমান।  

এর সঙ্গে আরও আছেন পুলিশের সাবেক ডিআইজি লায়ন খান সাঈদ হাসান, ডিআইজি আব্দুল জলিল (গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) লায়ন এসএম ফেরদৌস, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) লায়ন আব্দুল হান্নান, সাবেক দুদক পরিচালক তালেবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব আলী আহম্মেদ মাহমুদ, পুলিশ সুপার নুরুন্নবী মৃধা, খাদ্য বিভাগের ডিসি ড. সিরাজুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহেদুর রহমান, চৌধুরী গ্রুপ অব কোম্পানির এমডি লায়ন নজরুল ইসলাম ও ব্যবসায়ী এসএম শাহীন প্রমুখ। 

মূলত, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে সাবেক সরকারের আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতার হাত ধরেই গুলশানের লেকশোর হোটেলে যাত্রা শুরু করে এই প্রতারক প্রতিষ্ঠান অতিথি ডটকম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here