স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে পুরো ইউরোপ। তীব্র রোদে মহাদেশটির বিভিন্ন দেশের পিচঢালা রাস্তা গলে যাচ্ছে এবং ট্রামের লাইন বেঁকে যাওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে। প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বেশ কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে ইতিহাস গড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তীব্র তাপমাত্রার কারণে ইউরোপজুড়ে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এই মৃত্যুর তালিকায় বদ্ধ গাড়ির ভেতর প্রাণ হারানো বেশ কিছু শিশু এবং নদী বা জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে যাওয়া তরুণেরাও রয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণে মর্গ এবং মরদেহের সৎকার কেন্দ্রগুলো হিমশিম খাচ্ছে। গত ১৮ জুন থেকে ফ্রান্সে অন্তত ৭৪ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও আগামী জুলাই মাসে আরেকটি তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপে শুরু হওয়া এই তীব্র গরম গত কয়েক দিনে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র এবং জার্মানিতে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে এবং চেক প্রজাতন্ত্রে তা ৪০ ডিগ্রি স্পর্শ করেছে। সুইজারল্যান্ডের বাসেলে তাপমাত্রা রেকর্ড ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এছাড়া ১৮৭৪ সালের পর ডেনমার্কে ইতিহাসের সবচেয়ে গরম দিন এবং যুক্তরাজ্যে ইতিহাসের উষ্ণতম জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে। স্লোভাকিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পাশাপাশি হাঙ্গেরির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে পারদ ছুঁয়েছে ৪১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগইয়ার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রেস্তোরাঁগুলোকে বিনামূল্যে খাবার পানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্যদিকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এই তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন করে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস আসায় দেশটির কর্তৃপক্ষ জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে ইউরোপের মানুষের এই চরম দুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে। নেক্সটরা টিভির একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তীব্র রোদে বাইরে রাখা প্যানে মাত্র কয়েক মিনিটে ডিম ও বেকন ভাজা হয়ে যাচ্ছে। জার্মানি থেকে আসা ছবি ও ভিডিওতে গলে যাওয়া রাস্তা এবং উত্তাপে বেঁকে যাওয়া ট্রাম লাইনের দৃশ্য দেখা গেছে। নেদারল্যান্ডসের একটি ভিডিওতে গাড়ির প্লাস্টিক পেইন্ট গলে যাওয়া এবং রোদে শপিং কার্ট ও জুতো গলে যাওয়ার দৃশ্যও ভাইরাল হয়েছে। বার্লিনে সাধারণ মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে পুলিশকে ওয়াটার ক্যানন দিয়ে পানি ছিটাতে দেখা গেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সেই পানিতে ভিজে নিজেদের শরীর শীতল করার চেষ্টা করছেন।

