যেভাবে আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট

0
যেভাবে আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট

বর্তমান সময়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যেন দেশ পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কেননা, দেশটির নয় সদস্যের এই সর্বোচ্চ আদালতকে বারবার এমন সব বিতর্কিত ও জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হচ্ছে, যেগুলো আমেরিকার গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যে বিষয়গুলো নিয়ে সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলোর সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেগুলোর ভার পড়ছে আদালতের ওপর।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা। নিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং প্রায়ই আদালতে পরাজিত হলেও সেই রায়গুলোকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট শুধু আইনি সিদ্ধান্তই দিচ্ছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক মূল্যবোধ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং ক্ষমতার কাঠামোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।

ট্রান্সজেন্ডার অধিকার, নাগরিকত্বের প্রশ্ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা- এসব বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাধারণ মানুষের চোখে দেশের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন আদালত থেকে আসে, তখন সুপ্রিম কোর্টকে অনেক সময় সরকারের মতোই শক্তিশালী মনে হয়। অথচ প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের ভাষায়, আদালতের ভূমিকা হলো শুধু আইনি ও সাংবিধানিক নিয়মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া- যেন একজন আম্পায়ার খেলার নিয়ম প্রয়োগ করেন।

এই অবস্থার সঙ্গে কংগ্রেসের ভূমিকার বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার বদলে কংগ্রেস হয় অকার্যকর হয়ে পড়েছে, নয়তো নিজেদের ক্ষমতার বড় অংশ হোয়াইট হাউসের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের নীতির কারণে বাড়ছে আদালতের ভূমিকা
ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলা এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার অবস্থান নির্ধারণ করছে না; বরং সেই ক্ষমতার বণ্টনও নতুনভাবে সাজাচ্ছে।

ইতিহাসে এর আগেও সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে ছিল। দাসপ্রথার সময়, প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের সময়ও আদালত তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছিল।

বারাক ওবামার আমলে আদালত সমলিঙ্গ বিবাহ বৈধ ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক উদারনীতির একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

অন্যদিকে ২০২২ সালে গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার বাতিলের সিদ্ধান্ত রক্ষণশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য কয়েক দশকের প্রচেষ্টার পর বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

কেন দলীয় বিভাজনের বাইরে থাকতে পারছে না সুপ্রিম কোর্ট
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আদালত আরও বেশি রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পড়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আইনি যুক্তির ভিত্তিতে হলেও সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় সেগুলো দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

এর একটি কারণ হলো বিচারপতিদের মধ্যকার মতপার্থক্য এখন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তীব্র ভাষার ভিন্নমত অনেকের কাছে আদালতকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতের জায়গা হিসেবে তুলে ধরে।

ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে। তাদের মতে, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনোনীত বিচারপতিকে অনুমোদন না দিয়ে রিপাবলিকানরা রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছিল, কিন্তু ২০২০ সালে বিচারপতি রুথ বেডার গিন্সবার্গের মৃত্যুর পর ট্রাম্পের মনোনীত বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেটকে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেও আদালতের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং তার নিয়োগ করা বিচারপতিরা তার প্রতি আনুগত্য দেখাবেন- এমন ধারণাও বিতর্ক তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টকে ট্রাম্পের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক মনে করার আরেকটি কারণ হলো নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস কর্মজীবনের শুরুতে রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসনে কাজ করেছিলেন, যেখানে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট বা ‘একক নির্বাহী ক্ষমতা’ ধারণা নিয়ে রক্ষণশীল চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিল।

২০২৪ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলার এক সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রেসিডেন্টদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যাপক আইনি সুরক্ষা থাকার কথা উল্লেখ করে। এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্পের ক্ষমতার ধারণাকে শক্তিশালী করার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

সোমবার ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) এক কমিশনারকে বরখাস্ত করা নিয়ে মামলায় আদালত ১৯৩৫ সালের একটি পুরোনো নজির বাতিল করে। ওই নজিরের মাধ্যমে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের সরকারি সংস্থার প্রধানদের সরানোর ক্ষমতার ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল।

এই সিদ্ধান্তের ফলে এফটিসি’র মতো স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকরা।

ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রায়কে ‘গত ১০০ বছরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি’ বলে মন্তব্য করেছেন।

কংগ্রেস পিছিয়ে পড়ায় আদালতের গুরুত্ব বেড়েছে
সুপ্রিম কোর্টের প্রভাব বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো কংগ্রেসের কার্যকর আইন প্রণয়নে ব্যর্থতা।

অভিবাসন ইস্যুতে সাম্প্রতিক মামলাগুলোর অনেকগুলো হয়তো আদালত পর্যন্ত আসতো না, যদি কংগ্রেস দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারমূলক আইন পাস করতে পারতো। যেমন- যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও হাইতির মতো দেশ থেকে আসা কিছু অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী থাকার অনুমতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। একটি পূর্ণাঙ্গ অভিবাসন আইন থাকলে এই জটিলতা আগেই সমাধান হতে পারত।

তবে সুপ্রিম কোর্ট সবসময় ট্রাম্পের নীতির পক্ষে যায়নি। ২০২৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত জানায়, প্রেসিডেন্ট জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ করতে পারবেন না। এতে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বড় ধাক্কা খায়।

অন্যদিকে সোমবার আদালত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির একটি চ্যালেঞ্জও প্রত্যাখ্যান করে। এতে মিসিসিপির এমন একটি আইন বহাল থাকে, যেখানে নির্বাচনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছানো কিছু ব্যালট গণনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আমেরিকার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লড়াই
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কিছু রায় আবার একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার পরিধি বাড়াচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে, অন্যদিকে একই আদালত অনেক ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর সীমাও আরোপ করছে।

নিম্ন আদালতগুলোও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত ধীর করেছে। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আগেই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষমতার পরিধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

ভবিষ্যতে কোনও ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে তিনি হয়তো ট্রাম্প আমলের তৈরি নজির ব্যবহার করে নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন- যদি আদালতের নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি একই থাকে।

তবে কংগ্রেস যদি নিজেদের সাংবিধানিক ভূমিকা পুনরুদ্ধার না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে থাকবে- এই প্রশ্নের কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। সূত্র: সিএনএন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here