বড় ভূমিকম্পে ঝুঁকিতে রাজধানীর ৬০ শতাংশ এলাকা, বলছে সমীক্ষা

0
বড় ভূমিকম্পে ঝুঁকিতে রাজধানীর ৬০ শতাংশ এলাকা, বলছে সমীক্ষা

অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাভূমি ভরাট এবং ঝুঁকিপূর্ণ মাটির ওপর ব্যাপক নির্মাণের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বিস্তীর্ণ অংশ এমন মাটির ওপর গড়ে উঠেছে, যেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় মাটি তরলসদৃশ আচরণ করতে পারে। এতে ভবন ধসে পড়া কিংবা কাত হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজউক ও বুয়েটের যৌথ এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা উচ্চ ভূমিকম্পজনিত ধসে পড়া বা তরলীকরণ (Liquefaction) ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে এসব এলাকায় প্রকৌশলগত মান অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ না করা হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

রাজউকের আওতাধীন ১,৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীর অর্ধেকেরও বেশি অংশ তরলীকরণ ঝুঁকি মানচিত্রের রেড ও ম্যাজেন্টা জোনে রয়েছে, যা সর্বোচ্চ ঝুঁকির নির্দেশক।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, এসব এলাকায় শুধু তরলীকরণের ঝুঁকিই নয়, ভূকম্পনের তীব্রতা বা গ্রাউন্ড মোশন অ্যাম্পলিফিকেশনও বেশি হতে পারে। এর মূল কারণ হলো আলগা, বালুময় কিংবা কৃত্রিমভাবে ভরাট করা মাটি।

তিনি বলেন, “এই এলাকাগুলোতে উচ্চ ভূকম্পন বিবর্ধনেরও ঝুঁকি রয়েছে, কারণ উভয় ঝুঁকিই আলগা বা কৃত্রিমভাবে ভরাট করা মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত।”

বুয়েটের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, শহরকে চারটি তরলীকরণ সম্ভাব্য সূচক (LPI) অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। ১৫-এর বেশি এলপিআই-সম্পন্ন এলাকাকে লাল, ১০-১৫ ম্যাজেন্টা, ৫-১০ নীল এবং ৫-এর নিচে সবুজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আনসারীর ভাষ্য, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে লাল জোনে ব্যাপক ভূমিধস ও ভূমির অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পুকুর, খাল ও নদীর আশপাশে, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তুলনামূলক উঁচু।

তিনি ১৯৮৫ সালের মেক্সিকো সিটি ভূমিকম্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্র প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে হলেও নরম মাটি ভূকম্পনের তরঙ্গকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তার ভাষায়, বালুময় ভরাট মাটি তরলীকরণ ও ভূকম্পন বিবর্ধন—দুটিই ঘটায়। অন্যদিকে নরম কাদামাটির ভরাট এলাকায় প্রধানত কম্পনের তীব্রতা বেড়ে যায়। উভয় অবস্থাই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, বালু নদী ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী অনেক নতুন আবাসিক এলাকা ভরাট করা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে নিরাপদ নির্মাণ সম্ভব হলেও আগে মাটির যথাযথ শোধন বা উন্নয়ন জরুরি। কিন্তু উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই কাজ করা হয় না।

আনসারীর মতে, ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভরাট এলাকায় পার্শ্ববর্তী মাটির উন্নয়ন না করেই শুধু পাইলের ওপর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি ভারতের ২০০১ সালের কান্দলা বন্দর ভূমিকম্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুর্বল ও পানিসিক্ত মাটিতে স্থাপিত ৬০ ফুট গভীর পাইলের ওপর নির্মিত একটি ভবন প্রায় ১৫ ডিগ্রি হেলে পড়েছিল।

আনসারী জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত সিমেন্ট ইনজেকশন প্রযুক্তি বেলে মাটি শক্তিশালী করতে কার্যকর হতে পারে। তার মতে, ভরাট মাটির গভীরতা ৪০-৪৫ মিটার হলেও উপরের মাত্র ৫ থেকে ৬ মিটার মাটি শক্তিশালী করা গেলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

তিনি সতর্ক করে বলেন, মাটির উন্নয়ন ছাড়া উপরের ও নিচের দুর্বল স্তর অস্থিতিশীলই থেকে যায়। ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে পাইল বাঁকতে পারে এবং ভবন হেলে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, ঢাকার মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্তিশালী লাল প্লিস্টোসিন মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি অংশ জলাভূমি, প্লাবনভূমি, পরিত্যক্ত নদীখাত ও নিচু অববাহিকায় গড়ে ওঠায় সেগুলো ভূমিকম্পে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

তার মতে, পুরান ঢাকা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, খিলগাঁও, মতিঝিল, ফার্মগেট ও মিরপুর তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী মাটির ওপর অবস্থিত।

অন্যদিকে বাসাবো, বাড্ডা, উত্তরখান ও দক্ষিণখানের কিছু এলাকায় মাঝারি মানের মাটি রয়েছে, যেখানে ভূপৃষ্ঠের ১০ থেকে ২০ ফুট নিচে শক্ত লাল মাটির স্তর পাওয়া যায়।

এর বিপরীতে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে নরম কাদামাটি ও সাম্প্রতিক ভরাট মাটির ৮০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে লাল মাটির স্তর রয়েছে। ফলে এসব স্থানে নিরাপদ নির্মাণ আরও জটিল হয়ে পড়ে।

জিল্লুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সাবেক জলাভূমি এলাকায় ভূকম্পনের তরঙ্গের তীব্রতা দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাই ভবনের উচ্চতা ও নকশা অবশ্যই স্থানীয় মাটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে অনুরণন (Resonance) এড়ানো যায়।

তিনি বলেন, যেকোনো জায়গায় ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। তবে নকশা অবশ্যই মাটির প্রকৃতি অনুযায়ী হতে হবে। নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশ আরবান রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রামের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, নরম মাটির ঝুঁকি মানচিত্র অনেক আগেই প্রস্তুত হয়েছে। তবে রাজউক এখনো সেটিকে নগর পরিকল্পনার মূল কাঠামোর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করেনি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি)-২০২২ গেজেট হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এই মানচিত্রটি পেয়েছে।

তিনি বলেন, মানচিত্রটি বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। ডিএপি হালনাগাদ করা হলে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এদিকে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, সদস্য ডেভেলপাররা ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ জাতীয় নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করছেন।

তিনি বলেন, আমরা যে ইস্পাত, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করি, সেগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তৈরি করা হয়।

সম্প্রতি ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর রিহ্যাব একটি কন্ট্রোল রুম চালু করেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সদস্যদের কোনো প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ৭ মাত্রার বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাব কী হবে, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন।

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here