অ্যাপ দিয়ে কী ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতিমুক্ত হবে?

0
অ্যাপ দিয়ে কী ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতিমুক্ত হবে?

ঘুষ ও বিলম্বের কারণে বাংলাদেশে জমি কেনা ও নিবন্ধন দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকার জিও-ফেন্সিং এবং মোবাইল অ্যাপের মতো ডিজিটাল প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। সরকারের লক্ষ্য মানুষের মাধ্যম কাজ কমানো এবং জালিয়াতি প্রতিরোধ করা। তবে, সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ভূমি অফিসে দুর্নীতি কমেনি বরং বেড়েছে। যা প্রমাণ করে প্রযুক্তি কাজকে দ্রুততর করতে পারলেও কয়েক দশক পুরোনো ঘুষের ব্যবস্থা পরিবর্তন করা অনেক বেশি কঠিন এক লড়াই।

এ বিষয়ে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেছেন, ভূমি পরিষেবা সহজ, দ্রুত এবং আরও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি পরিষেবা প্রদানে মানুষের সংস্পর্শ কমানোই মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, মানুষ যত বেশি ডিজিটালভাবে পরিষেবা পাবে দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগ তত কমবে।

এক লাখের বেশি ডাউনলোড হওয়া ভূমি অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-মিউটেশন আবেদন ও তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ, জমির রেকর্ড অনুসন্ধান ও যাচাই, খতিয়ান ও মৌজার ডিজিটাল কপি সংগ্রহ, অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, উত্তরাধিকারের অংশ হিসাব করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে সংযুক্ত একটি সমন্বিত ভূমিমালিক প্রোফাইল রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ দেয়।

ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্‌মটিতে অনভিজ্ঞ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে ৮৯৩টি পরিষেবা কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। সেখানে নাগরিকরা নামমাত্র ফি-এর বিনিময়ে সহায়তা পেতে পারেন বলে জানান তিনি।

গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি উপলব্ধি করে মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে।

নাগরিকদের অনলাইন ভূমি পরিষেবার সাথে পরিচিত করার জন্য নির্দেশনামূলক ভিডিও এবং তথ্য উপকরণও বিতরণ করছে সরকার। এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনেকেই এখনো দালালদের উপর নির্ভর করছেন।

ঢাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম সম্প্রতি ডিজিটাল ভূমি পরিষেবা ব্যবহার করেছেন। তিনি জানান, অনলাইন অ্যাপটি ভূমি প্রশাসনের সাথে জড়িত ঝামেলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

তিনি বলেন, আমি অনলাইনে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করেছি এবং প্রয়োজনে একটি পরিষেবা কেন্দ্র থেকে সহায়তাও পেয়েছি। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এতে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয়েছে।

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল জ্ঞান সীমিত। সেইসঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগের অভাব এখনও অ্যাপটির ব্যাপক ব্যবহারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, এখনো এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে দালালদের মাধ্যমে ফাইল দ্রুত লেনদেন হয়। প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কয়েক দশকের অনানুষ্ঠানিক প্রথাকে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

এর পাশপাশি অফিসে কমরতকর্তাদের অনুপুস্থিতি নিয়েও সমস্যা ও অভিযোগের শেষ নেই । এর সমাধানে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামক আরও একটি অ্যাপ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারও হয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমি অফিসগুলোর চারপাশে ভার্চুয়াল সীমানা তৈরি করবে। যার ফলে সুপারভাইজাররা একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল বলেন, যদি কোনো কর্মকর্তা অফিস চলাকালীন নির্ধারিত অফিসের সীমানা ছেড়ে যান তাহলে সিস্টেমটি তাৎক্ষণিকভাবে ড্যাশবোর্ডে তা প্রতিফলিত করবে।

হেলাল উদ্দীন একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের দিকেও ইঙ্গিত করে বলেন, ভূমি প্রশাসন এবং ভূমি নিবন্ধন দুটি পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পড়ে। যদিও অনেকে মনে করেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। কিন্তু এগুলো আইন মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয়।

তার মতে, ভূমি প্রশাসনের সাথে সম্পর্কিত অনেক অনিয়ম আসলে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলাকালীনই শুরু হয়। যার মধ্যে রয়েছে জাল দলিল এবং নথিপত্র-সংক্রান্ত বিরোধ। এই সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সরকার ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ সম্প্রসারণ করছে। একটি কেন্দ্রীয় ভূমি তথ্য-ভাণ্ডার তৈরি করছে। নির্ভুলতা বাড়াতে ও বিরোধ কমাতে ভূমি নিবন্ধনকে ভূমি তথ্য ব্যবস্থার সাথে একীভূত করছে। এছাড়াও, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণকে iBAS++ প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। যাতে সুবিধাভোগীদের কাছে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর করা যায়। এতে অনিয়মের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ভূমি সেবা গ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ৬৬.২ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। যা ২০২৩ সালের ৫১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪৭.৬ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এই হিসেবে পরিবার প্রতি গড় অননুমোদিত ঘুষের পরিমাণ ১১,৩১০ টাকায় পৌঁছেছে।

জরিপটিতে অনুমান করা হয়েছে যে, ভূমি সেবা খাতে ঘুষের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রায় ৩,০৮১ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যা জরিপে অন্তর্ভুক্ত সকল সরকারি সেবা খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ভূমি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো বিচার ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট দেশের এই বিপুল পরিমাণ দেওয়ানি মামলার জটের একটি প্রধান কারণ হলো ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ।

সূত্র : টিবিএস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here