যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা এক চরম নাটকীয়তা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। গত ১৪ জুন পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় দুই দেশের মধ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করা হয়, যা পরবর্তীতে ১৭ জুন ভার্সাইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ১৮ জুন তেহরানে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেন। তবে এই ঐতিহাসিক শান্তি প্রক্রিয়াটি শুরু হতেই নানা পক্ষের প্রতিবন্ধকতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের মুখে পড়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
স্থায়ী শান্তি চুক্তি রূপায়নের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে গত ১৯ জুন থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর মধ্যে তীব্র সংঘাতের কারণে সমঝোতা স্মারকের প্রথম শর্তটি লঙ্ঘিত হয়, যেখানে লেবাননসহ সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান আলোচনা বয়কটের ঘোষণা দেয় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দেয়। ফলে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার নির্ধারিত সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করেন। তবে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ২০ জুন ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে পৌঁছালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সাথে যোগ দিতে সেখানে রওনা হন।
গত ২১ জুন সকালে লেক লুসার্ন সামিট নামে পরিচিত এই আলোচনাটি শুরু হয়। বৈঠকে জেডি ভ্যান্স মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক সূচনা বক্তব্য দেন এবং ইরানের সাথে সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ইরান যদি আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করা এবং পরমাণু অস্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন করতে প্রস্তুত। তবে এই ইতিবাচক আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বৈঠক শুরুর মাত্র ৮০ মিনিট পর একটি বড় ধরনের ধাক্কা আসে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বসেন। হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিতে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালী খোলা না রাখলে ইরানি আলোচনাকারীরা আর কোনোদিন তাদের দেশে ফিরতে পারবে না, এমনকি তাদের ফেরার মতো কোনো দেশই থাকবে না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন আপত্তিকর ও হুমকিস্বরূপ মন্তব্যের পর বৈঠকে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ইরানি প্রতিনিধি দল তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হুমকি বিবেচনা করে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং বৈঠক থেকে সাময়িক ওয়াকআউট করে। পরবর্তীতে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আলোচনা মধ্যরাত পর্যন্ত গড়ায়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনাকে অত্যন্ত জটিল ও বিশৃঙ্খল হিসেবে বর্ণনা করলেও নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানি দল স্থায়ীভাবে আলোচনা বর্জন করেনি এবং গভীর রাত পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি প্রক্রিয়ার ভেতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি এখন এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।

