কোরীয় উপদ্বীপে ফের উত্তেজনা, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামরিক শক্তি

0
কোরীয় উপদ্বীপে ফের উত্তেজনা, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামরিক শক্তি

কোরীয় উপদ্বীপে আবারও সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে। গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া ধারাবাহিকভাবে সামরিক সক্ষমতা জোরদারের কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়াও আধুনিক ড্রোন বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের পাল্টাপাল্টি সামরিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গত মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার বন্দরনগরী নামফোতে পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী যুদ্ধজাহাজ ‘চো হাইওন’-এর আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি অনুষ্ঠানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি যুদ্ধজাহাজ নৌবহরে যুক্ত হওয়ার পর এখন ধারাবাহিকভাবে ১০ হাজার টন শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর এক দিন পর, বৃহস্পতিবার কিম জং উনের উপস্থিতিতে উত্তর কোরিয়া উন্নত সংস্করণের রকেট গোলন্দাজ ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালায়। এটি দেশটির পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ।

পরীক্ষা শেষে কিম বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় কেবল শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। এ কারণে প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি তাদের জাতীয় কৌশলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম উৎপাদনের একটি নতুন কারখানাও জনসমক্ষে প্রদর্শন করে।

উত্তর কোরিয়ার এসব সামরিক কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে তারাও পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির জবাবে ড্রোনের সংখ্যা এবং কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, পাঁচ লাখ সেনাসদস্যকে দক্ষ ড্রোনযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মতোই সহজে ড্রোন পরিচালনা করতে পারেন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর সামনের সারির ইউনিটগুলোতে ১০ হাজার ড্রোন সরবরাহ করা হবে। পর্যায়ক্রমে ড্রোনের ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, ড্রোনকে আর শুধু বিশেষ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। তাঁর মতে, প্রতিটি সেনাসদস্যের জন্য এটি রাইফেলের মতো দ্বিতীয় ব্যক্তিগত অস্ত্র হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধের ধরনই বদলে দিচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জাপানের উপনিবেশ থেকে কোরীয় উপদ্বীপ মুক্ত হওয়ার পরই নতুন রাজনৈতিক বিভাজনের সূচনা হয়। সে সময় বিশ্বের দুই পরাশক্তি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র উপদ্বীপের দুই অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে, আর দক্ষিণাঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৯৪৮ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ কোরিয়া এবং পরের মাস সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর কোরিয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরিতাপূর্ণ।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরিয়া যুদ্ধে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত থেমে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই কোরিয়া এখনো যুদ্ধাবস্থাতেই রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে শান্তি আলোচনা ও দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। বরং সময়ে সময়েই দুই দেশের যুদ্ধংদেহী অবস্থান কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

তথ্যসূত্র : রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here