ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড অবস্থায় পড়েছে ভেনিজুয়েলা। যেকোনো বড় ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা সুবর্ণ সময়। ভেনিজুয়েলায় গত ২৪ জুন ভূমিকম্পটি হওয়ার পর সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে গেছে। সময় ফুরিয়ে আসায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের খোঁজে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন হাজারো মানুষ।
ভূমিকম্পে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরের এই রাজ্যটি এখন আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপের পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। সেখানে নিখোঁজদের স্বজনরা প্রিয়জনদের জীবিত ফেরাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। অনেক জায়গায় সরকারি উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা হাতুড়ি, ড্রিল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব কাটার চেষ্টা করছেন। তাদের বিশ্বাস, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো জীবিত মানুষ আটকে আছেন।
‘ওখানে এখনও মানুষ জীবিত আছে’
লা গুয়াইরায় দেখা গেছে, হাতুড়ি আর পাওয়ার টুল দিয়ে কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব ভাঙার চেষ্টা করছেন অনেকে। সেই শব্দের ভেতরেই ভেসে আসছে স্বজনদের কান্না। এমনই এক ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাজারেথ জিমেনেজ। তিনি অসহায় কণ্ঠে বলছিলেন, ‘হে ঈশ্বর, আমরা ওদের ওখান থেকে কীভাবে বের করব?’
নাজারেথ জিমেনেজ জানান, তার ভাইবোন, ভাইয়ের ছেলে-মেয়ে এবং বন্ধুরা কংক্রিটের নিচে আটকে আছেন। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ভারী যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট সরানোর আধুনিক সরঞ্জাম মিলছে না। বিশ্ববাসীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বজুড়ে সরকার ও দেশগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি। ওখানে এখনও মানুষ জীবিত আছে।’
ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের ধীরগতিতে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। লা গুয়াইরার ২৫ বছর বয়সি জেনিফার প্যালাসিওস নামের এক মা জানান, হুগো শ্যাভেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের আটটি টাওয়ার ধসে পড়েছে। ওই ভবনে তার ছয় বছরের সন্তানসহ মোট ছয়জন আত্মীয় আটকে আছেন। আকুল কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের চেষ্টায় এ পর্যন্ত কয়েকজনকে জীবিত বের করা গেছে। আমাদের এখন ক্রেন দরকার। কংক্রিটের নিচে এখনো অনেকে বেঁচে আছেন।’
সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে লা গুয়াইরা
এদিকে ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে খাদ্য ও পানি বিতরণ শুরু করেছে সরকারি বাহিনী। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে মানুষকে জীবিত উদ্ধারে সরকার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’ একই সঙ্গে তিনি সারা বিশ্ব থেকে আসা উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লা গুয়াইরা রাজ্যকে বর্তমানে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আরও সাহায্য পাঠানো হচ্ছে বলে সরকার জানিয়েছে। তবে দুর্গত বাসিন্দাদের দাবি, যে পরিমাণ সাহায্য আসছে, তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
ভূমিকম্প আঘাত হানার তিন দিন পর ভেনিজুয়েলায় উদ্ধারকারীরা এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন। এই দুর্যোগে ইতোমধ্যে অন্তত ৯২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ৫১ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধার তৎপরতায় জাতিসংঘ
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্পে প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ছিল এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
দুর্যোগ-পরবর্তী এই সংকট মোকাবিলায় ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, ভারী যন্ত্রপাতি এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছে।
জাতিসংঘের ত্রাণ প্রধান টম ফ্লেচার ভেনিজুয়েলার জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘ভেনিজুয়েলার জনগণ, যাদের প্রিয়জনরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন, জেনে রাখুন, আমরা আপনাদের কাছে সাহায্য পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

