উদ্বাস্তু বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া একঝাঁক প্রবাসী তরুণ আর এক অভিজ্ঞ ও বিনয়ী অধিনায়কের কাঁধে ভর করে ফুটবলের মহাযজ্ঞে হাজির হয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ১৯৯০-এর দশকের ভয়াবহ যুদ্ধের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়ানো ছোট এই ইউরোপীয় দেশটির জন্য এবারের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা কেবল ফুটবলীয় সাফল্য নয় বরং এটি জাতীয় গৌরব আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য উপাখ্যান।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘বি’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক কানাডার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল বসনিয়া। খেলা শুরুর ঠিক আগে এক মেঘলা বিকেলে টরেন্টোর প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে যখন ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার এডিন জেকো ডাগআউটের পাশে দাঁড়িয়ে খুদে সমর্থকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন, তখন তার মুখের চেনা হাসিটাই যেন বলে দিচ্ছিল এই দলের দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। মাত্র ছয় বছর বয়সে যুদ্ধ দেখতে হয়েছিল জেকোকে। যে সায়াহ্নগুলোতে তার বন্ধুদের সাথে গলির ফুটবল খেলার কথা ছিল, সেখানে বোমার আঘাতে একে একে হারিয়ে গেছে শৈশবের খেলার সাথীরা। সেই জেকো আজ বিশ্বকাপের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ দলটির নেতা, যার সতীর্থদের বড় অংশই জন্ম নিয়েছে ভিনদেশে যুদ্ধ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়া বসনিয়ান বাবা-মায়ের ঘরে।
অথচ এই আসরে বসনিয়ার পা রাখাটা ছিল প্রায় অসম্ভব এক অলৌকিক ঘটনা। গত দুই বাছাইপর্বের ১৯টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র চারটিতে জয় পেয়েছিল তারা, হেরেছিল টানা পাঁচটি প্লে-অফ। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডাগআউটে বদলেছে পাঁচজন কোচ। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা আর ভঙ্গুর ফুটবল অবকাঠামো যেখানে প্রতিনিয়ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালে দলের দায়িত্ব নেন সাবেক অধিনায়ক সের্গেই বারবারেজ। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি দলে ১৬ জন নতুন মুখ নিয়ে আসেন। আর তাতেই বদলে যায় দৃশ্যপট।
চলতি বছরের শুরুতে শক্তিশালী ইতালিকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয় বসনিয়া। সেই মহানাটকীয় ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে জন্ম নেওয়া ২১ বছর বয়সী উইঙ্গার এসমির বাজরাকতারেভিচ জয়সূচক পেনাল্টিটি নেন। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে ফেরা উদ্বাস্তু বাবা-মায়ের এই সন্তান যুক্তরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলে খেললেও, মূল জাতীয় দলের জন্য নিজের শিকড়কেই বেছে নেন। এই জয়ের পর রাজধানী সারায়েভোর রাস্তায় প্রায় এক লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল। যুদ্ধের সময় যাদের পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার নীল নকশা করা হয়েছিল, আজ বিশ্বমঞ্চে তাদের সন্তানদের এই পদচারণাকে অনেকেই দেখছেন এক মধুর প্রতিশোধ হিসেবে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এক স্কোয়াড নিয়ে এসেছে বসনিয়া। বিশ্বের রেকর্ড ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন লিগে খেলেন এই দলের ফুটবলাররা। বিশ্লেষকরা একে দেখছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বসনিয়ান সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন হিসেবে। কানাডার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া প্রথম ম্যাচের পর ইতোমধ্যে ২৩ বছর বয়সী তারিক মুহারেমোভিচের মতো ডিফেন্ডাররা নজর কেড়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল বোদ্ধাদের।
সমর্থকদের বিশ্বাস, এই বিশ্বকাপ কেবল তাদের ফুটবলীয় পরিচিতিই বাড়াবে না বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পর্যটন ও সংস্কৃতির দিক থেকেও বসনিয়াকে নতুন করে চিনতে শেখাবে পৃথিবীকে। সুইজারল্যান্ড কিংবা কাতারের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, প্রবাসী এই তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে বসনিয়ার ফুটবলের যে এক নতুন ও উজ্জ্বল যুগের সূচনা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সূত্র: মিডলইস্ট আই

