একসময় যুব কংগ্রেস সভানেত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত রাজীব গান্ধীর স্নেহভাজনও ছিলেন তিনি। দলের হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, ১৯৯১ সালে মন্ত্রীও ছিলেন। পরে কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ বাধে। তৈরি হয় দূরত্ব। এরপরই কংগ্রেস ছাড়েন। ১৯৯৮ সালে তার হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৬ সালে ফের একবার রাজনীতির নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মমতা।
২৮ বছর আগে যে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, কালের আবহে সেই পুরোনো দলেই কি ফিরতে চলেছেন মমতা ব্যানার্জি? দিল্লির রাজনৈতিক মহলে এটাই এখন সবচেয়ে চর্চিত বিষয়।
তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পরই বিগত বামফ্রন্ট সরকারের বড় সমালোচক ছিলেন মমতা। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল এই তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনটি মেয়াদে টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা ছিল তার দল, নিজেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। দিল্লিতে বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন মমতা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচক হিসেবে একেবারে প্রথম সারিতে নাম ছিল তার।
কিন্তু বিগত বিধানসভায নির্বাচনে ভরাডুবির পর ভেঙে খানখান সেই তৃণমূল। একাধিক নেতা নেত্রী, বিধায়ক, সাংসদ- কেউ পদ ছেড়েছেন, কেউ দল ছেড়েছেন। লোকসভায় তৃণমূলের সদস্য সংখ্যা ২৮, এরমধ্যে ২০ জনের বেশি সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। রাজ্যসভায় ১৩ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২ জন ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে, দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ইতোমধ্যেই ২০ জনের বেশি বিধায়ক বিদ্রোহী তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন। আগামী দিনে সংখ্যাটা বাড়ার রয়েছে সমূহ সম্ভাবনা।
এমন অবস্থায় গত সোমবার দিল্লিতে বিরোধী দলের জোট ইন্ডিয়ার বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। সঙ্গে ছিলেন ভাইপো ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। বৈঠকে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধীর বাম দিকে বসেন মমতা। বৈঠকের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, সোনিয়া গান্ধী এবং মমতা ব্যানার্জি একে অপরকে আলিঙ্গন করছেন।
পরে গত মঙ্গলবার সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। বুধবার সেই ১০ জনপথে লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং কংগ্রেস সংসদ রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করলেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। রাহুল ও অভিষেকের সেই বৈঠক প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়েই এই দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়।
আর এরপরেই দিল্লির রাজনীতিতে জল্পনা ছড়িয়েছে তবে কি তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরতে চলেছেন মমতা-অভিষেক? কংগ্রেসের সাথে মিশিয়ে দিতে চান তৃণমূলকে? বুধবার বিকালে দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরেন মমতা ব্যানার্জি। কলকাতা বিমানবন্দরে মমতাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
যদিও অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, তৃণমূলে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তা কীভাবে রোখা যায়, তা নিয়ে মূলত সোনিয়া বা রাহুলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন মমতা ও অভিষেক।
কি বলছেন নেতারা?
এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসের সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, ‘রাজনীতি সম্ভাবনামায় শিল্প। ফলে আগামীতে যেকোনো কিছুই হতে পারে। আরএসএসের বিচারধারা এবং বিজেপির একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রাহুল গান্ধী। আমরা মনে করি, রাহুল গান্ধীরই প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। আর এটাকে যিনি মেনে নেবেন তাদের সবার জন্য আমাদের দরজা খোলা আছে।’
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান বলেছেন, ‘অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো মন্তব্য করা যায় না। আগে হোক, তারপর দেখা যাবে।’ মমতা যদি কংগ্রেসে ফিরে আসে তবে কি তিনি মানবেন? উত্তরে মমতার বিশ্বাস যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মমতার কার্যকলাপের ওপর কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। তার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে।’
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি বলছেন, ‘আমরা তো যাচ্ছি না, তাহলে যাচ্ছে কে? আমি যতদূর জানি লোকসভার ২০ জন সংসদ সদস্য কংগ্রেসে যোগ দেবেন না, রাজ্যসভার সংসদ সদস্যরা যোগ দেবে না, পশ্চিমবঙ্গের ৬৪ জন তৃণমূল বিধায়কও কংগ্রেসে যোগ দেবেন না। ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠছে না।
মমতাঘনিষ্ঠ তৃণমূলের বিধায়ক কুনাল ঘোষ জানিয়েছেন, ‘কংগ্রেস এবং তৃণমূলের দুই শীর্ষ নেত্রী একে অপরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা করতেই পারেন। তবে এই বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো মন্তব্য করাটা সমীচীন নয়।’
তবে ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে প্রণব মুখার্জির মতো নেতারও ফের কংগ্রেসের ফেরার রেকর্ড রয়েছে।

