ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম; বাহারি সব নামে বহুরঙা ফিচার আর কন্টেন্ট নিয়ে বর্তমান তরুণ সমাজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। এসবের বদৌলতে কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে তরুণদের চোখ আটকে যাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির পর্দায়। দিনের আলোর দোলাচলে টুংটাং আলাপের পর রাতে আরও সরব হয়ে ওঠে এই ভার্চুয়াল দুনিয়া। তরুণ প্রজন্ম সেখানে বুঁদ হয়ে যায়, নানা আয়োজনে চলে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা। এটা একরকম আধুনিক নার্সিসিজমও বটে। আত্মপ্রেমে ডুবতে ডুবতে একসময় এই তরুণরা হয়ে ওঠেন বড্ডবেশি এককেন্দ্রিক আর একঘেঁয়ে।
সোশ্যাল মিডিয়ার চক্করে তারা বাস্তবের সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। যে বন্ধুদের সাথে নানা ভার্চুয়াল সোশ্যাল গ্রুপে ধুন্ধুমার আড্ডা হয় রাতভর, দিনের বেলায় তাদের মুখোমুখি হলেও হয়তো কথা হয় দু-চারটে। বাকি সময়ও চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল আলাপ। এই আলাপনের মাঝেই বাস্তবের মানুষের সাথে বাড়ে ভার্চুয়াল মানুষের দূরত্ব।
এই দ্বৈত দুনিয়া সমালাতে গিয়ে অনেকেই খেই হারান। তারা আসলে মুখ আর মুখোশের পার্থক্যটা ভুলে যান, ভুলে যান ফিল্টারে ঘষে চকচক করা মুখের সাথে বাস্তব মুখায়বের বিস্তর ফারাক। সে কারণেই তৈরি হয় সন্দেহ, দানা বাঁধে স্বার্থপরতার বাষ্পকণা। মানুষ নিজের ভেতরে থেকেও হয়ে যায় একা। আত্মকেন্দ্রিকতার এই ব্যাধি তাকে একসময় বিচ্ছেদের মতো ঘটনার দিকেও ঠেলে দেয়।
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, দাম্পত্য বিচ্ছেদের মতো ঘটনার পেছনেও আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। বলা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দম্পতিদের পরস্পরবিদ্বেষী বিবৃতি, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে সন্দেহজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ও ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রকাশ বিয়ে বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া একে অন্যের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাধ্যম।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ যদি কারো সাথে প্রতারণা বা ছলচাতুরী করতে চায় তাহলে সোশ্যাল মিডিয়াই হলো সবচেয়ে সহজ পন্থা। এর মাধ্যমেই কাউকে কাছে টানা যায় আবার দূরেও ঠেলা যায়। ফেসবুক বা টুইটারের মতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব সহজেই যে কেউ সখ্য বা একটু গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে পারেন। বিনিময় করতে পারেন উষ্ণ আবেগের আদান-প্রদান। অনেক সময় আদান-প্রদানের বা প্রকাশিত ছবি নিয়ে পোহাতে হতে পারে নানা বিড়ম্বনা। তাই সোশ্যালের ওয়ালে কোনো কিছু প্রকাশ করার আগে সবার উচিত সতর্ক থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, কর্মস্থল কিংবা বাড়ির বাইরের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলো মাস কিংবা বছরের ব্যবধানে বাস্তব রূপ নেয়। অথচ ফেসবুকের ক্ষেত্রে মাউসের একটি ক্লিকেই এ ঘটনা বাস্তব হয়। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো প্রচলিত প্রেম-নিবেদনের সাইটগুলোর চেয়ে ভিন্ন। কারণ এর মাধ্যমে পুরনো অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধবের পাশাপাশি মাত্র এক বা দুদিনের পরিচয় হয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গেও বন্ধুত্ব করা যায়। এগিয়ে নেওয়া যায় সম্পর্ক।
সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অনেক সামাজিক অস্থিরতা ও সম্পর্ক বিচ্ছেদের মতো ঘটনাগুলোতে প্রভাবক হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম। একটি জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী বিবাহিত নারী পুরুষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রভাবিত নানা সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া অনেক সময় উষ্ণ আবেদনময় তথ্য আদান-প্রদান করে মনের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছে গোপন প্রেম বা পরকীয়ায়। ফলে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী এখন রাতে ঘুমায় না দিনে ঝিমায়। যা তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক কর্মজীবন পর্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এখনই এসব বিষয়ে সচেতন না হলে এসব মাধ্যমই হতে পারে সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ।

