এভারেস্টে আটকা এক সপ্তাহ, বেঁচে ছিলেন ‘বরফ ও চকলেট’ খেয়ে

0
এভারেস্টে আটকা এক সপ্তাহ, বেঁচে ছিলেন ‘বরফ ও চকলেট’ খেয়ে

মাউন্ট এভারেস্টের বিপজ্জনক ঢালে প্রায় এক সপ্তাহ আটকা পড়ে থেকেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এক নেপালি পর্বতারোহী গাইড জানিয়েছেন, তিনি ‘বরফ চিবিয়ে’ খেয়ে নিজেকে জীবিত রেখেছেন।

৫২ বছর বয়সী ওই গাইডের নাম হিলারি দাওয়া শেরপা। তিনি নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর বৃহস্পতিবার তাকে হামাগুড়ি দিয়ে বেস ক্যাম্পে ফিরে আসতে দেখা যায়।

গত বৃহস্পতিবার সকালে বেস ক্যাম্পের ঠিক ওপরে অবস্থিত খুম্বু আইসফল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের একটি দল দাওয়াকে খুঁজে পায়।

একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার তাকে কাঠমান্ডুর হামস হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি তার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। তার পরিবার প্রায় তার ফিরে আসার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল এবং তার জন্য শেষকৃত্যের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু করেছিল। বর্তমানে তাকে ফ্রস্টবাইট (তীব্র ঠাণ্ডায় টিস্যু জমে যাওয়া), পানিশূন্যতা এবং একটি হাড় ভেঙে যাওয়ায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বিবিসি নেপালিকে বলেন, ‘আমি ভাবিনি যে আমি বেঁচে থাকব। আমি ভেবেছিলাম, এভাবেই আমার মৃত্যু হবে।’

সাবেক ব্রিটিশ সেনাসদস্য ক্রিস থ্রল ছিলেন সর্বশেষ ব্যক্তি যিনি ২৯ মে দাওয়াকে দেখেছিলেন, তার নিখোঁজ হওয়ার আগে। থ্রল তার অভিযাত্রী দলের একজন পোলিশ সদস্যকে খুঁজতে ৫০ থেকে ১০০ মিটার নিচে নেমে গিয়েছিলেন। ওই পোলিশ আরোহী তীব্র ফ্রস্টবাইটে ভুগছিলেন এবং তার কাছে কোনো অক্সিজেন ছিল না।

থ্রল যখন ওপরের দিকে তাকালেন, তখন দাওয়াকে তার পেছনে দেখতে পাননি।

দাওয়া বিবিসিকে জানান, তার নিজের অক্সিজেনও শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি বিপদে পড়ে যান।

তিনি বলেন, ‘আমি হাঁটতে পারছিলাম না। প্রথম দুই দিন আমি কিছুই খাইনি। তারপর আমি বরফ চিবানো শুরু করি। এতে আমার দাঁতে ব্যথা হতো। আমি শক্ত করে বরফ চিবাতাম।’

আশার এক ঝলক দেখা দেয় যখন তিনি নিজের একটি পকেটে কিছু চকলেট খুঁজে পান। এগুলো তাকে নিচে নামার মতো শক্তি দেয় এবং বেঁচে থাকার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু তার আশাবাদ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ নিচে নামার সময় দাওয়া একটি গভীর বরফ-ফাটলে আটকা পড়ে যান এবং আড়াই দিন ধরে সেখান আটকে থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি।

ঠিক তখনই একটি তুষারধস তাকে রক্ষা করে। তুষারধসের ফলে এত পরিমাণ তুষার সেই ফাটলের মধ্যে জমা হয় যে তিনি তার ওপর পা রেখে উপরে উঠতে এবং বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে সক্ষম হন।

আরেকটি তুষারধস তার খুব কাছ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি এবং ‘সারা রাত ধরে হেঁটেছেন’। অবশেষে প্রায় এক সপ্তাহ পর তিনি প্রথমবারের মতো আরেকজন মানুষের দেখা পান।

উদ্ধার তৎপরতার তদারককারী প্রতিষ্ঠান ৮কে এক্সপেডিশনের পেম্বা শেরপা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, অভিজ্ঞ এই পর্বতারোহীকে ‘বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি… হামাগুড়ি দিয়ে নিচে নামতে’ দেখা যায়। তার ‘কিছুটা ফ্রস্টবাইট’ ছিল, তবে অন্যান্য দিক থেকে তার শারীরিক অবস্থা মোটামুটি ভালো ছিল।

দাওয়া নিরাপদে ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও তার পরিবার ক্ষুব্ধ। তারা অভিযোগ করেছে, তার উদ্ধারে অনেক আগেই অভিযান শুরু করা উচিত ছিল এবং স্থানীয় গাইড হওয়ায় তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে।

তারা দাওয়ার নিয়োগকর্তা কাঠমান্ডুভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান ট্রাভার্সের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং নেপালের পর্যটন বিভাগের কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে। এই বিভাগই দেশটির পর্বতারোহণ কার্যক্রম তদারকি করে থাকে।

দাওয়ার ভাতিজা কর্মা গেলজে শেরপা বলেন, ‘পর্বতারোহণ বিভাগকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। উদ্ধার অভিযান শুরু করতে এত বিলম্ব হওয়ার পেছনে কোম্পানির অবহেলাই দায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি তিনি কোনো বিদেশি পর্বতারোহী হতেন, তাহলে অবশ্যই অনেক দ্রুত ও তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হতো। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন বয়স্ক নেপালি।’

সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here