দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার কিছুটা কমলেও প্রকৃত উন্নতি নয়, বরং ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও রাইট-অফের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকৃত সংকট আড়াল করা হয়েছে বলে মনে করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব তথ্য উপস্থাপন করেন।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ফাহমিদা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু সূচকে স্বস্তির আভাস মিললেও তা স্থায়ী নয়; বরং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫.৭ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২.২৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত অর্থে সম্পদ মানের উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত স্বাস্থ্যকর আড়াল করেছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে আর্থিক খাত, সামাজিক খাত এবং উৎপাদনশীল খাত নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব চাপ নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরেই তা দৃশ্যমান। মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়ন, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সংকট ও চাপ বিদ্যমান, তা থেকে এখনো পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব হয়নি।
প্রবন্ধে সিপিডি বলছে, ঋণ-ক্ষতি সংরক্ষণ (লোন লস প্রভিশনিং) ঘাটতির কিছু উন্নতি দেখা গেলেও তা সম্পদের গুণগত মান উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না। বরং রাইট-অফ ও পুনর্গঠনের কারণে সূচকগুলো কিছুটা ভালো দেখাচ্ছে। ব্যাংক খাতে অন্তর্নিহিত ঋণঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণসংক্রান্ত দুর্বলতা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতিরও একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মোট তরল সম্পদের বিপরীতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে। এর অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা দুর্বল রয়েছে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সিপিডি আরও বলছে, ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে। এ অবস্থায় সিপিডি কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার, পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করা এবং পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে।
সিপিডির প্রতিবেদনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উল্লেখ করে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ফাহমিদা বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও কমেনি, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সংকটগুলো সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১৬ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতি তার চেয়ে বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

